মরমী সাধক, বাউল সম্রাট এবং চিরন্তন প্রেমের কবি হাসন রাজার স্মৃতিবিজড়িত মাটি সুনামগঞ্জ। বাংলার লোকসাহিত্যের এই মহান মনীষীর জীবনদর্শন, সৃষ্টিশীলতা ও জমিদারী আমলের নানান দুর্লভ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুনামগঞ্জ শহরের সুরমা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা ‘হাসন রাজার জাদুঘর’।
১. ইতিহাস ও হাসন রাজার বাড়ি
- জন্ম ও বসতভিটা: সুনামগঞ্জ শহরের সুরমা নদীর তীর সংলগ্ন এলাকায় ১৮৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন মরমী সাধক হাসন রাজা। তাঁর এই পৈতৃক বাড়িতেই রচিত হয়েছে ‘সব লোকে কয় হাসন রাজা কি গান গায়’-এর মতো অমর ও অসামান্য সব মরমী গান।
- জাদুঘর প্রতিষ্ঠা: হাসন রাজার স্মৃতিকে সংরক্ষণ করতে তাঁর এই বাড়িতেই গড়ে তোলা হয়েছে জাদুঘর। জাদুঘরের প্রবেশপথে প্রথমে বাউল সম্রাট লালন শাহ এবং পরবর্তীতে হাসন রাজার প্রতিকৃতি ও দুর্লভ আলোকচিত্র দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায়। কলকাতার একটি স্টুডিও থেকে সংগৃহীত ১৯৬২ সালের একটিমাত্র আলোকচিত্র ছাড়াও এখানে বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা আট-নয়টি ছবি রয়েছে।
২. জাদুঘরে যা যা দেখতে পাবেন
জাদুঘরটিকে জীবন্ত করে রেখেছে হাসন রাজার স্মৃতিবিজড়িত নানা নিদর্শন:
- টেবিল-চেয়ার: যে চেয়ারে বসে তিনি তন্ময় হয়ে গান রচনা করতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
- রঙিন আলখাল্লা: হাসন রাজা সাধারণ সময়ে সাদা ধুতি বা সাদাসিধে পোশাক পরলেও, অন্য কোনো রাজা বা ইংরেজ সাহেবদের সঙ্গে দেখা করার সময় বিশেষ পোশাক হিসেবে এই রঙিন আলখাল্লাটি পরিধান করতেন।
- পানি পরিশোধন পাত্র: ১৯০২ সালে উইলিয়াম লিটল নামে এক ইংরেজ নায়েব অস্ট্রিয়া থেকে ছোট জগের মতো দেখতে এই ফিল্টারটি এনে তাঁকে উপহার দিয়েছিলেন।
- তলোয়ার ও ক্যাশবাক্স: পুরুষানুক্রমে তাঁর হাতে আসা পারিবারিক তলোয়ার এবং জমিদারির কাজে ব্যবহৃত কাঠের ক্যাশবাক্স।
- মাটির হাঁড়ি: জনশ্রুতি আছে, এই হাঁড়িতে পয়সা ভরে হাসন রাজা শিশুদের মধ্যে তা ছিটিয়ে দিতেন।
- অন্যান্য নিদর্শন: এছাড়া তাঁর ব্যবহৃত চায়ের টেবিল, দুধ খাওয়ার পাত্র, বাটি, দুধ দোহনের পাত্র, পানদানি, কাঠের খড়ম, শেষ বয়সে ব্যবহূত লাঠি, মোমদানি, পিতলের পানির কলস, নিজ হাতে লেখা গানের কপি এবং ঢোল, করতাল, মন্দিরার মতো কিছু বাদ্যযন্ত্র।

৩. ঢাকা থেকে যাতায়াত ব্যবস্থা
ঢাকা থেকে সড়কপথে খুব সহজেই হাসন রাজার জাদুঘরে যাতায়াত করা যায়:
- ঢাকার সায়দাবাদ, ফকিরাপুল বা মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এনা পরিবহন বা মামুন পরিবহনের নন-এসি/এসি বাসে সরাসরি সুনামগঞ্জ জেলা সদরে যাওয়া যায় (ভাড়া সাধারণত ৫৫০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে)।
- সুনামগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় সরাসরি সাহেববাজার ঘাট পর্যন্ত যেতে হবে। সাহেব বাড়ির ঘাটের ঠিক পাশেই হাসন রাজার জাদুঘর অবস্থিত।
৪. কোথায় থাকবেন (সুনামগঞ্জ শহর)
সুনামগঞ্জ শহরে পর্যটকদের থাকার জন্য অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে ২০০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকার মধ্যে বিভিন্ন আবাসিক হোটেল রয়েছে:
- হোটেল নূর: পূর্ববাজার স্টেশন রোড, সুনামগঞ্জ।
- হোটেল সারপিনিয়া: জগন্নাথবাড়ী রোড, সুনামগঞ্জ।
- হোটেল নূরানী: পুরাতন বাস স্ট্যান্ড, সুনামগঞ্জ।
- হোটেল মিজান: পূর্ব বাজার, সুনামগঞ্জ।
- হোটেল প্যালেস: পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, স্টেশন রোড, সুনামগঞ্জ।
- সুরমা ভ্যালী আবাসিক রিসোর্ট: সুনামগঞ্জ শহর।
৫. সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: হাসন রাজার জাদুঘর পরিদর্শনের উপযুক্ত সময় কোনটি?
উত্তর: বছরের যেকোনো সময়ই দিনের আলোতে (সকাল থেকে সন্ধ্যার মধ্যে) জাদুঘরটি ঘুরে দেখা যায়।
প্রশ্ন ২: জাদুঘরে কি হাসন রাজার কোনো মৌলিক ছবি রয়েছে?
উত্তর: হ্যাঁ, কলকাতার একটি স্টুডিও থেকে ১৯৬২ সালে সংগ্রহ করা হাসন রাজার একটিমাত্র দুর্লভ আলোকচিত্র এবং বিভিন্ন শিল্পীর আঁকা বেশ কিছু পোর্ট্রেট এখানে সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রশ্ন ৩: সুনামগঞ্জ শহর থেকে জাদুঘরে কীভাবে যাওয়া যায়?
উত্তর: সুনামগঞ্জ নতুন বা পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থেকে রিকশায় চড়ে সরাসরি সুরমা নদীর তীর সংলগ্ন সাহেববাজার ঘাটে অবস্থিত হাসন রাজার জাদুঘরে পৌঁছে যাওয়া যায়।



