বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্য প্রকৃতি, পাহাড়ি টিলা ও চা বাগানের পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক অনন্য জনপদ হলো মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের মাঝে নিজ ঐতিহ্যের স্বকীয়তা বজায় রেখে বসবাস করে আসছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অন্যতম প্রাচীন সম্প্রদায় মণিপুরী সম্প্রদায়। মৌলভীবাজার সদর থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার দূরে শ্রীমঙ্গল উপজেলার কমলগঞ্জ থানার আদমপুর ইউনিয়নে এই সম্প্রদায়ের হাতের তৈরি কাপড়ের ব্যবসা ও বসতিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিখ্যাত ‘মণিপুরী পল্লী’। ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, রঙিন সংস্কৃতি এবং বিখ্যাত ‘রাস উৎসব’-এর সুবাদে এটি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণের একটি স্থান।
১. ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য
মণিপুরী সম্প্রদায়ের ইতিহাস এবং তাদের সাংস্কৃতিক বিকাশ বেশ সমৃদ্ধ ও প্রাচীন:
- ঐতিহাসিক পটভূমি: ত্রয়োদশ শতাব্দীর দিকে মনিপুরীরা বর্তমান ভারতের মণিপুর রাজ্য থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক কারণে আসাম, ত্রিপুরা ও পরবর্তীতে বাংলাদেশের সিলেটে এসে বসতি স্থাপন শুরু করেন। শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ অঞ্চলে শত শত বছর ধরে তারা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছেন এবং নিজেদের ভাষা, ধর্ম, নৃত্য ও শিল্পরীতি অত্যন্ত যত্নসহকারে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
- হস্তশিল্প ও তাঁতশিল্পের খ্যাতি: মণিপুরী পল্লীর নারীরা তাঁতশিল্পে অত্যন্ত পারদর্শী। তারা নিজেদের হাতে ঐতিহ্যবাহী নকশায় শাড়ি, থ্রি-পিস, চাদর, শাল, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, ব্যাগ ও বিভিন্ন গৃহস্থালি সামগ্রী তৈরি করেন। তাদের তৈরি সুতা ও কাপড়ের চমৎকার মান এবং আকর্ষণীয় রঙের বিন্যাস দেশ পেরিয়ে আজ আন্তর্জাতিক বাজারেও সমাদৃত।
- বিখ্যাত মণিপুরী নৃত্য ও রাস উৎসব: শ্রীমঙ্গলের পর্যটনে মণিপুরী সংস্কৃতির অবদান অপরিসীম। বিশেষ করে প্রতি বছর বাংলা অগ্রহায়ণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে উদযাপিত ঐতিহ্যবাহী ‘রাস উৎসব’ বা ‘রাস মেলা’ দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক এখানে সমবেত হন। এই মেলায় তাদের মনোমুগ্ধকর শাস্ত্রীয় নৃত্য এবং বর্ণিল ঐতিহ্যবাহী পোশাক বিশেষভাবে নজর কাড়ে। এছাড়া মণিপুরী সংস্কৃতির গভীরতর পরিচয় লাভের জন্য মাধবপুরে একটি সরকারি মণিপুরী সাংস্কৃতিক একাডেমীও প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।

২. ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে সড়ক, রেল ও আকাশপথে খুব সহজেই শ্রীমঙ্গলে পৌঁছে সেখান থেকে মণিপুরী পল্লীতে যাতায়াত করা যায়:
বাসযোগে যাতায়াত:
- ঢাকার ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ বা মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এনা পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন বা সিলেট এক্সপ্রেসের বাসে সরাসরি শ্রীমঙ্গল পৌঁছানো যায়। বাসের টিকিট মূল্য মানভেদে ৬০০ থেকে ১,০০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
ট্রেনযোগে যাতায়াত:
- ঢাকা কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা, উপবন, কালনী বা পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনে করে সরাসরি শ্রীমঙ্গল স্টেশনে আসা যায়। শ্রেণিভেদে ট্রেনের টিকিটের মূল্য সাধারণত ২৭৫ থেকে ৬২৭ টাকা বা তার বেশি হতে পারে। ট্রেন ভ্রমণ অত্যন্ত আরামদায়ক।
শ্রীমঙ্গল থেকে মণিপুরী পল্লী:
- শ্রীমঙ্গল শহর বা রেলওয়ে স্টেশন থেকে স্থানীয় যানবাহন (সিএনজি, অটোরিকশা বা জিপ) ভাড়া করে সরাসরি কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের মণিপুরী পল্লীতে পৌঁছানো যায়। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২৭ কিলোমিটার। এছাড়া শহরের বিভিন্ন দোকানেও মণিপুরী হস্তশিল্পের দোকান রয়েছে, তবে সরাসরি পল্লীতে গেলে তাদের তাঁত বোনার জীবন্ত দৃশ্য দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়।
৩. শ্রীমঙ্গলে কোথায় থাকবেন
মণিপুরী পল্লী বা শ্রীমঙ্গলের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার জন্য রাত্রিযাপনের ক্ষেত্রে শ্রীমঙ্গল উপজেলা সদরে বা এর কাছাকাছি পর্যটন এলাকায় অবস্থান করা সবচেয়ে সুবিধাজনক:
- শহরের আবাসিক হোটেল: বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য শ্রীমঙ্গল শহর ও চৌমুহনা এলাকায় অনেক মানসম্মত ও সাশ্রয়ী আবাসিক হোটেল (যেমন: হোটেল প্লাজা, হোটেল নিসর্গ, হোটেল মিডটাউন ইত্যাদি) রয়েছে।
- ইকো-রিসোর্ট ও কটেজ: চা বাগানের একদম কাছাকাছি প্রকৃতির মাঝে রাত কাটাতে চাইলে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন সুন্দর ইকো-রিসোর্ট বা কটেজে থাকতে পারেন।
- বিলাসবহুল রিসোর্ট: একটু প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতার জন্য শ্রীমঙ্গলের বিশ্বমানের রিসোর্ট যেমন—গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ, নৃত্যশিল্পী রিসোর্ট বা নভেম রিসোর্ট-এ আগে থেকেই রুম বুকিং করে রাখতে পারেন।
৪. সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: মণিপুরী পল্লী পরিদর্শনের উপযুক্ত সময় কোনটি?
উত্তর: বছরের যেকোনো সময়ই এখানে যাওয়া যায় এবং হস্তশিল্পের পণ্য কেনাকাটা করা যায়। তবে কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে (নভেম্বর মাস নাগাদ) যখন এখানে বিশ্বখ্যাত রাস মেলা অনুষ্ঠিত হয়, তখন ভ্রমণ করা সবচেয়ে দারুণ অভিজ্ঞতা দেয়।
প্রশ্ন ২: মণিপুরী পল্লী থেকে কী ধরনের পণ্য কেনা যায়?
উত্তর: এখানকার প্রধান আকর্ষণ হলো মণিপুরী তাঁতের শাড়ি, মেয়েদের থ্রি-পিস, ঐতিহ্যবাহী শাল, চাদর, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, কুশন কভার ও নান্দনিক ব্যাগ। এগুলো অত্যন্ত টেকসই ও দৃষ্টিনন্দন হয়।
প্রশ্ন ৩: মণিপুরী পল্লী দেখার জন্য কি কোনো প্রবেশমূল্য লাগে?
উত্তর: না, আদমপুরের মণিপুরী পল্লী বা গ্রাম ঘুরে দেখার জন্য কোনো ধরনের টিকিট বা প্রবেশমূল্য লাগে না। এটি একটি সাধারণ জনপদ ও হস্তশিল্পের পাড়া।
প্রশ্ন ৪: শ্রীমঙ্গল থেকে আদমপুর মণিপুরী পল্লী যাতায়াতে কেমন সময় লাগে?
উত্তর: শ্রীমঙ্গল শহর থেকে সিএনজি বা লোকাল যানবাহনে করে আদমপুর মণিপুরী পল্লীতে পৌঁছাতে সাধারণত ৪৫ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা সময় লাগে।



