মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ (Grand Sultan Tea Resort & Golf) বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে এক অনন্য ও বিলাসবহুল সংযোজন। চা বাগানের সবুজ বুক চিরে গড়ে ওঠা এই পাঁচতারকা মানের রিসোর্টটি কেবল দেশের ভেতর নয়, আন্তর্জাতিক মানেও সমাদৃত। যারা প্রকৃতির সান্নিধ্যে থেকে বিশ্বমানের আধুনিক আতিথেয়তা, বিলাসিতা ও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চান, তাদের জন্য এটি একটি আদর্শ অবকাশ যাপন কেন্দ্র।
১. ইতিহাস ও স্থাপত্যের বৈচিত্র্য
গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্টের গড়ে ওঠার নেপথ্য ভাবনা এবং এর নান্দনিক নির্মাণশৈলী দর্শনার্থীদের প্রথম দেখাতেই বিমোহিত করে:
- প্রতিষ্ঠা ও প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী খ্যাত শ্রীমঙ্গলের পর্যটন খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার উদ্দেশ্যে এই বিশাল রিসোর্টটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাকৃতিক পরিবেশের সামান্যতম ক্ষতি না করে, চা বাগানের সবুজ দৃশ্যপটকে অক্ষুণ্ণ রেখে এটি নির্মাণ করা হয়েছে।
- স্থাপত্য ও রয়্যাল লুক: রিসোর্টটির ভেতরে প্রবেশ করলে মনে হবে যেন কোনো রাজকীয় প্রাসাদে প্রবেশ করেছেন। এর স্থাপত্যশৈলীতে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সংস্কৃতির সাথে মুঘল ও আধুনিক রয়্যাল ডিজাইনের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটেছে। ভবনের ভেতরের ইন্টেরিয়র ডিজাইন, প্রাচীন আসবাবপত্রের আদল এবং রাজকীয় আলোকসজ্জা পর্যটকদের দারুণভাবে মুগ্ধ করে।
- পরিবেশ ও সবুজায়ন: প্রায় ১৩.৫ একর জমির ওপর নির্মিত এই রিসোর্টের চারপাশ ঘিরে রয়েছে চা বাগান, রাবার বাগান এবং হ্রদ। রিসোর্টের ভেতরে ও বাইরে সাজানো সুউচ্চ পাম গাছ, ফুলের বাগান এবং কৃত্রিম জলপ্রপাত এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
২. মূল আকর্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা
গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্টটি কেবল রাত্রিযাপনের স্থান নয়, এটি নিজেই একটি পরিপূর্ণ বিনোদন পার্ক। এখানে পর্যটকদের জন্য রয়েছে বিশ্বমানের সব সুযোগ-সুবিধা:
- আবাসিক কক্ষ ও স্যুট: রিসোর্টে স্ট্যান্ডার্ড রুম থেকে শুরু করে রয়্যাল স্যুট, প্রেসিডেন্সিয়াল স্যুট ও পেন্টহাউসসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির শতাধিক বিলাসবহুল রুম রয়েছে। প্রতিটি রুম থেকে চা বাগানের সবুজ উপত্যকা বা লেকের চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়।
- গলফ ও খেলাধুলা: রিসোর্টটির নামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এখানে রয়েছে একটি চমৎকার মিনি গলফ কোর্স। এছাড়া টেনিস কোর্ট, ব্যাডমিন্টন, বিলিয়ার্ড, স্কোয়াশ এবং ইনডোর গেমসের সুব্যবস্থা রয়েছে।
- সুইমিং পুল ও স্পা: নারী ও পুরুষদের জন্য পৃথক বা ইনফিনিটি সুইমিং পুলের ব্যবস্থা রয়েছে, যেখান থেকে চারপাশের প্রকৃতির দৃশ্য উপভোগ করা যায়। ক্লান্তি দূর করতে রয়েছে বিশ্বমানের স্পা ও জিমনেসিয়াম।
- সিনেমা হল ও কিডস জোন: শিশুদের আনন্দের জন্য রয়েছে আধুনিক কিডস জোন এবং পরিবারের সবাই মিলে উপভোগ করার জন্য রিসোর্টের ভেতরেই রয়েছে একটি অত্যাধুনিক থিয়েটার বা সিনেমা হল।
- রেস্টুরেন্ট ও ডাইনিং: এখানে রয়েছে একাধিক মাল্টি-কুইজিন রেস্টুরেন্ট, যেখানে দেশি ঐতিহ্যবাহী খাবারের পাশাপাশি থাই, চাইনিজ ও কন্টিনেন্টাল সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করা হয়।

৩. ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন
রাজধানী ঢাকা থেকে সড়ক ও রেলপথে খুব সহজেই গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফে যাতায়াত করা যায়:
ট্রেনযোগে যাতায়াত:
- ঢাকা কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা, উপবন বা কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনে করে সরাসরি শ্রীমঙ্গল স্টেশনে নামা যায়। ট্রেন যাত্রা খুবই আরামদায়ক। শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশন থেকে রিসোর্টের নিজস্ব ট্রান্সপোর্ট বা সিএনজিযোগে মাত্র ১৫-২০ মিনিটেই সরাসরি গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্টে পৌঁছানো সম্ভব।
বাসযোগে যাতায়াত:
- ঢাকার ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ বা মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন বা এনা পরিবহনের এসি/নন-এসি বাসে সরাসরি শ্রীমঙ্গল পৌঁছানো যায়। শ্রীমঙ্গল বাস স্ট্যান্ড বা চৌমুহনা থেকে সিএনজি বা রিসোর্টের পিকআপ সার্ভিসের মাধ্যমে সহজেই রিসোর্টে যাওয়া যায়।
৪. সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্টে রুম বুকিংয়ের খরচ কেমন হয়?
উত্তর: রুমের ধরণ (যেমন- ডিলাক্স রুম, প্রিমিয়ার রুম, রয়্যাল স্যুট ইত্যাদি) এবং সিজন ভেদে রাতের খরচ সাধারণত ১০,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০,০০০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে। ছুটির দিনগুলোতে বা পিক সেশনে যাওয়ার আগে অনলাইন বা সরাসরি কল করে বুকিং কনফার্ম করা উচিত।
প্রশ্ন ২: রিসোর্টে প্রবেশের জন্য কি ডে-লং বা ভিজিটর পাস পাওয়া যায়?
উত্তর: গ্র্যান্ড সুলতান একটি অত্যন্ত সুরক্ষিত ও এক্সক্লুসিভ পাঁচতারকা রিসোর্ট। সাধারণত শুধুমাত্র আবাসিক অতিথি বা রেজিস্টার্ড গেস্টদের জন্য এর ভেতরে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকে। তবে নির্দিষ্ট ফি দিয়ে ডে-লং বা ভিজিটর পাস নেওয়ার সুযোগের বিষয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আগে থেকেই যোগাযোগ করে নেওয়া ভালো।
প্রশ্ন ৩: গ্র্যান্ড সুলতান রিসোর্ট পরিদর্শনের সেরা সময় কোনটি?
উত্তর: বছরের যেকোনো সময়ই এখানে যাওয়া যায়। তবে শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) আবহাওয়া অত্যন্ত মনোরম থাকে এবং চারপাশের চা বাগানের সবুজ রূপ পুরোপুরি উপভোগ করার জন্য এটি সেরা সময়।
প্রশ্ন ৪: কর্পোরেট মিটিং বা ইভেন্টের জন্য কি এখানে কোনো বিশেষ সুবিধা আছে?
উত্তর: হ্যাঁ, বড় করপোরেট সভা, সেমিনার, আন্তর্জাতিক কনফারেন্স কিংবা ডেস্টিনেশন ওয়েডিং বা পারিবারিক যেকোনো বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য এখানে অত্যাধুনিক কনফারেন্স হল ও বলরুমের সুব্যবস্থা রয়েছে।



