বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র ‘কিরীটী রায়’-এর স্রষ্টা ও প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক নীহাররঞ্জন গুপ্তের পৈতৃক নিবাস নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার ইতনা গ্রামে অবস্থিত। ব্রিটিশ আমলের এক অনন্য স্থাপত্যশৈলী এবং সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক বাড়িটি সাহিত্যপ্রেমী ও ইতিহাসবিদদের জন্য এক আকর্ষণীয় গন্তব্য। কালের বিবর্তনে জৌলুস হারালেও এর পুরোনো স্থাপত্যের রূপ আজও দর্শনার্থীদের অতীত দিনে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
১. ইতিহাস, জন্মপরিচয় ও স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য
নীহাররঞ্জন গুপ্তের জীবন এবং তাঁর পৈতৃক বাড়ির স্থাপত্যসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
- জন্ম ও পৈতৃক নিবাস: প্রখ্যাত বাঙালি ঔপন্যাসিক নীহাররঞ্জন গুপ্ত মূলত ভারতের কলকাতায় জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর পৈতৃক মূল নিবাস ছিল নড়াইল জেলার লোহাগড়া উপজেলার ইতনা গ্রামে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশোনা করলেও সাহিত্যের প্রতি তাঁর আজীবন অনুরাগ ছিল এবং তিনি ডিটেকটিভ উপন্যাসের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন।
- অবস্থান ও আয়তন: নড়াইল জেলা শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে ইতনা গ্রামে প্রায় ৭০ শতক জমির ওপর এই ঐতিহাসিক বাড়িটি বিস্তৃত।
- স্থাপত্যশৈলী ও গঠন: দোতলা বিশিষ্ট এই ঐতিহাসিক বাড়িটির উত্তর অংশে তিনটি কক্ষ ও একটি মন্দিরসহ বারান্দা রয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণ অংশে রয়েছে সাতটি কক্ষ এবং খিলানযুক্ত একটি সরু বারান্দা। ভবনটির প্রতিটি কক্ষের ভেতরে একাধিক কুলঙ্গি ও দেওয়াল আলমারি রয়েছে, যা সেই আমলের স্থাপত্যের শৈল্পিক উৎকর্ষ প্রকাশ করে। বিশেষ করে দরজা, জানালা এবং দেওয়াল আলমারির গায়ে কাঠের চমৎকার কারুকার্য ও লতাপাতার অলংকরণ বাড়িটির সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। বাড়ির সামনে একটি পুরোনো পুকুর রয়েছে, যা এর প্রাচীন ঐতিহ্যকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
- সংরক্ষণ ও বর্তমান অবস্থা: ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ভবনটিকে সরকারিভাবে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। এছাড়া ১৯৯০-এর দশকে প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী আলী আজগর রাজা এবং শিক্ষক নারায়ণ চন্দ্র বিশ্বাস এখানে শিশুদের চিত্রকলা শেখানোর জন্য “শিশু স্বর্গ-২” নামে একটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তবে পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে সেটি স্থায়ী হয়নি। বর্তমানে সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্রিটিশ আমলের এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত ও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
২. ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন
নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাড়ি দেখতে চাইলে প্রথমে আপনাকে রাজধানী ঢাকা থেকে সড়কপথে নড়াইল জেলা সদর কিংবা সরাসরি লোহাগড়ায় পৌঁছাতে হবে:
সড়কপথ (বাসে যাতায়াত):
- পথ ও দূরত্ব: ঢাকা থেকে সড়কপথে (পদ্মা সেতু হয়ে এবং আধুনিক এক্সপ্রেসওয়ে রুট ধরে) নড়াইল ও লোহাগড়ার দূরত্ব প্রায় ৩১০ কিলোমিটার।
- বাস নির্বাচন: ঢাকার গাবতলী, সায়েদাবাদ, কল্যাণপুর বা মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে নড়াইল বা লোহাগড়াগামী বিভিন্ন মানসম্মত এসি ও নন-এসি বাস (যেমন: হানিফ এন্টারপ্রাইজ, ঈগল পরিবহন, গোল্ডেন লাইন, টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস ইত্যাদি) নিয়মিত চলাচল করে।
- সময় ও ভাড়া: ঢাকা থেকে নড়াইল বা লোহাগড়া পৌঁছাতে সাধারণত ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। বাসের টিকিটের মূল্য মানভেদে ৬০০ থেকে ১,৪০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
নড়াইল শহর বা লোহাগড়া থেকে ইতনা গ্রাম:
- নড়াইল জেলা শহর বা লোহাগড়া উপজেলা সদর থেকে লোকাল বাস, সিএনজি, ইজিবাইক কিংবা রিকশাযোগে খুব সহজেই লোহাগড়ার ইতনা গ্রামে অবস্থিত নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাড়িতে পৌঁছানো যায়।
৩. কোথায় থাকবেন
নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাড়ি কিংবা নড়াইলের অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থানগুলো ঘুরে দেখার জন্য রাত্রিযাপনের ক্ষেত্রে নড়াইল জেলা সদরকেই মূল ঘাঁটি হিসেবে বেছে নেওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক। নড়াইল সদরে বেশ কিছু ভালো মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে:
১. হোটেল রূপালী (Hotel Rupali):
- অবস্থান: চৌরঙ্গী মোড়, নড়াইল সদর।
- বৈশিষ্ট্য: এটি নড়াইল শহরের অন্যতম পরিচিত ও মানসম্মত আবাসিক হোটেল। এখানে সাশ্রয়ী মূল্যে এসি ও নন-এসি রুমের সুব্যবস্থা রয়েছে।
২. লোহাগড়া উপজেলা সদরের ডাকবাংলো:
- সরকারি নিয়ম ও অনুমতি সাপেক্ষে লোহাগড়া উপজেলা সদরের সরকারি ডাকবাংলো বা গেস্টহাউসেও থাকার সুযোগ থাকতে পারে।
৩. অন্যান্য বাজেট হোটেল:
- নড়াইল নতুন বাস টার্মিনাল ও রূপগঞ্জ বাজার সংলগ্ন এলাকায় আরও কিছু সাধারণ মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে, যেখানে পর্যটকরা স্বাচ্ছন্দ্যে রাত কাটাতে পারেন।
৪. সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: নীহাররঞ্জন গুপ্তের বাড়ি পরিদর্শনের উপযুক্ত সময় কোনটি?
উত্তর: বছরের যেকোনো সময়ই এখানে যাওয়া যায়। তবে আরামদায়ক আবহাওয়ায় গ্রামীণ পরিবেশ ঘুরে দেখার জন্য শীতকাল (অক্টোবর থেকে মার্চ) সবচেয়ে উপযোগী সময়।
প্রশ্ন ২: বাড়িটিতে প্রবেশের জন্য কি কোনো টিকিট বা প্রবেশমূল্য লাগে?
উত্তর: না, ঐতিহাসিক এই বাড়িটি দেখার জন্য কোনো ধরনের প্রবেশমূল্য বা টিকিট লাগে না। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত হওয়ায় এটি সকলের জন্য উন্মুক্ত একটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি।
প্রশ্ন৩: ইতনা গ্রামে বা বাড়ির আশেপাশে খাওয়ার জন্য কোনো ভালো হোটেল আছে কি?
উত্তর: ইতনা একটি গ্রামীণ এলাকা হওয়ায় সেখানে বড় কোনো আধুনিক রেস্তোরাঁ বা হোটেল নেই। হালকা নাস্তা বা পানির প্রয়োজন হলে সাথে রাখা ভালো। মূল খাওয়া-দাওয়ার জন্য লোহাগড়া বাজার কিংবা নড়াইল শহর সদরে ফিরে আসাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
প্রশ্ন ৪: সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য এই স্থানটির বিশেষত্ব কী?
উত্তর: বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ‘কিরীটী রায়’-এর স্রষ্টা ঔপন্যাসিক নীহাররঞ্জন গুপ্তের শেকড় এবং তাঁর পৈতৃক স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি এটি হওয়ায় সাহিত্যপ্রেমী ও গবেষকদের কাছে স্থানটির ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম।



