আলেকজান্ডার ক্যাসেল, ময়মনসিংহ: ইতিহাস, যাতায়াত, আবাসন, নেতিবাচক দিক, রেটিং এবং ভ্রমণ নির্দেশিকা
ময়মনসিংহ শহরের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থাপনাসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি আকর্ষণ হলো আলেকজান্ডার ক্যাসেল (Alexander Castle Tourist Spot), যা স্থানীয়ভাবে ‘লোহার কুঠি’ নামেও সমাদৃত। নান্দনিক কারুকার্য, ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যরীতি এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্বের পদচারণায় মুখরিত এই ঐতিহাসিক স্থানটি ভ্রমণপিপাসুদের সবসময়ই আকর্ষণ করে। এই নিবন্ধে আমরা আলেকজান্ডার ক্যাসেলের ইতিহাস, দর্শনীয় দিক, যাতায়াত, আবাসন, নেতিবাচক দিক, রেটিং এবং কিছু সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ) সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।
আলেকজান্ডার ক্যাসেলের ইতিহাস ও পটভূমি
- নির্মাণ ও প্রেক্ষাপট: ময়মনসিংহ জেলার প্রতিষ্ঠা শতবার্ষিকী উদ্যাপনের প্রাক্কালে মুক্তাগাছার প্রখ্যাত জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী ১৮৭৯ থেকে ১৮৮৯ সালের দিকে ব্রহ্মপুত্র নদের কাছাকাছি প্রায় ২৭ একর জমির ওপর এই সুরম্য বাগানবাড়িটি নির্মাণ করেন। তৎকালীন সময়ে এটি নির্মাণে প্রায় ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল।
- নামকরণের ইতিহাস: তৎকালীন ভারতের ব্রিটিশ শাসক সপ্তম এডওয়ার্ডের স্ত্রী রানি আলেকজান্দ্রার নামানুসারে ভবনটির নাম রাখা হয়েছিল ‘আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল’, যা পরবর্তীতে লোকমুখে ‘আলেকজান্ডার ক্যাসেল’ নামে পরিচিতি পায়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, তৎকালীন কালেক্টর এন. এস. আলেকজান্ডারের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছিল। ভবনটিতে প্রচুর লোহা ও ধাতব উপাদান ব্যবহৃত হওয়ায় সাধারণ মানুষ একে ‘লোহার কুঠি’ বলেও ডাকতেন।
- বরেণ্য ব্যক্তিদের পদার্পণ: ১৯২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ময়মনসিংহ সফরে এসে এই ক্যাসেলে অতিথিশায় কিছু দিন অবস্থান করেছিলেন। এছাড়াও এখানে এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, লর্ড কার্জন, নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো বরেণ্য ব্যক্তিরা। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে এটি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে এটি কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
আলেকজান্ডার ক্যাসেলে ভ্রমণে কী কী দেখবেন?
- লোহা ও কাঠের অনন্য স্থাপত্য: ভবনটির ছাদ ঢেউখেলানো টিন ও লোহার তৈরি এবং এর পুরো কাঠামোটি একটি বিশেষ স্তম্ভমূলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। দোতলার সিলিংয়ে অভ্র ও চুমকি ব্যবহার করা হয়েছিল, যাতে গরমের দিনে ভবনটি ঠান্ডা থাকে।
- ঐতিহাসিক প্রবেশদ্বার ও মূর্তি: ক্যাসেলের প্রবেশপথের সামনে একসময় সুন্দর মার্বেল পাথরের মূর্তি ও গ্রিক দেবীর অবয়ব ছিল।
- টিচার্স ট্রেনিং কলেজ প্রাঙ্গণ: বর্তমানে এটি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ভেতরে অবস্থিত হওয়ায় এর চারপাশের শান্ত ও ছায়াঘেরা পরিবেশ যে কাউকে মুগ্ধ করে।
নেতিবাচক দিক (Negative Aspects)
ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও আলেকজান্ডার ক্যাসেলের কিছু বড় নেতিবাচক দিক রয়েছে:
- অবহেলা ও রক্ষণাবেহনের অভাব: প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর একে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করলেও দীর্ঘদিন যথাযথ সংস্কারের অভাবে ভবনটির পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং লোহার বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
- মূর্তির ক্ষতি ও অরক্ষিত অবস্থা: প্রবেশদ্বারের পুরোনো মার্বেল ভাস্কর্যগুলোর হাত ভেঙে গেছে এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বহু নিদর্শন আজ প্রায় ধ্বংসের মুখে।
- অভ্যন্তরীণ প্রবেশাধিকার সীমিত: ভবনটি বর্তমানে কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় ভেতরের অংশ সব সময় সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে না।
ভ্রমণ রেটিং (Rating)
- ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত মূল্য: ৪.৭ / ৫
- যাতায়াত ও অবস্থান: ৪.৯ / ৫
- সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ: ৩.২ / ৫
- সামগ্রিক অভিজ্ঞতা: ৪.১ / ৫

ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন (যাতায়াত ব্যবস্থা)
ঢাকা থেকে সড়ক বা রেলপথে খুব সহজেই ময়মনসিংহ শহরে পৌঁছে আলেকজান্ডার ক্যাসেল যাওয়া যায়:
- বাসে যাতায়াত: ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে এনা পরিবহন বা অন্যান্য দূরপাল্লার বাসে চড়ে সরাসরি ময়মনসিংহ শহরে নামতে পারেন (সময় লাগে প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা)।
- ট্রেনযোগে: ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে তিস্তা এক্সপ্রেস, যমুনা এক্সপ্রেস, ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেস বা অগ্নিবীণা ট্রেনে চড়ে সরাসরি ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশনে নামতে পারেন।
- স্থানীয় যাতায়াত: ময়মনসিংহ রেলওয়ে স্টেশন বা শহর থেকে রিকশা বা অটোরিকশায় চড়ে সহজেই কোর্ট-কাচারি সংলগ্ন টিচার্স ট্রেনিং কলেজ চত্বরে অবস্থিত আলেকজান্ডার ক্যাসেল পৌঁছাতে পারবেন।
কোথায় থাকবেন (নিকটবর্তী আবাসন ব্যবস্থা ও যোগাযোগের নম্বর)
ময়মনসিংহ জেলা শহর হওয়ায় এখানে রাত্রিযাপনের জন্য বেশ কিছু মানসম্মত আবাসিক হোটেল রয়েছে। যোগাযোগের নম্বরসহ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য হোটেলের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. হোটেল আমির ইন্টারন্যাশনাল (Hotel Amir International):
- যোগাযোগ: ০১৯১১৯৮৮৮৩৩, ০১৭-১১৮৫৪৪৫৬
- ঠিকানা: গাঙ্গিনাপাড়, ময়মনসিংহ। ২. হোটেল মুস্তাফিজ (Hotel Mustafiz):
- যোগাযোগ: ০৯১-৬৭৪৪৫, ০১৭-১২৩২৪৬৭৮
- ঠিকানা: স্টেশন রোড, ময়মনসিংহ। ৩. অন্যান্য হোটেল: সিলভার ক্যাসেল বা হোটেল হেরা।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: আলেকজান্ডার ক্যাসেল কি ভেতরে ঢুকে দেখা যায়?
উত্তর: এটি বর্তমানে টিচার্স ট্রেনিং কলেজের লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় এর ভেতরের অংশে সাধারণের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকতে পারে, তবে আপনি বাইরে থেকে এর অপূর্ব ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও নকশা উপভোগ করতে পারবেন।
প্রশ্ন ২: আলেকজান্ডার ক্যাসেল পরিদর্শনের জন্য কোনো টিকিট লাগে কি?
উত্তর: এটি উন্মুক্ত কলেজ প্রাঙ্গণের ভেতরে অবস্থিত হওয়ায় বাইরে থেকে দেখার জন্য কোনো টিকিট লাগে না।
প্রশ্ন ৩: এর কাছাকাছি আর কী কী দর্শনীয় স্থান আছে?
উত্তর: আলেকজান্ডার ক্যাসেলের খুব কাছেই রয়েছে ঐতিহাসিক শশী লজ, ব্রহ্মপুত্র নদ, এবং জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা ও পার্ক। এগুলো একই দিনে অনায়াসে ঘুরে দেখা সম্ভব।



