মধুটিলা ইকোপার্ক, শেরপুর: ইতিহাস, যাতায়াত, আবাসন ও ভ্রমণ নির্দেশিকা
প্রকৃতির সবুজ চাদর, ছোট-বড় পাহাড়ি টিলা আর বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্যময় সমাহার দেখতে চাইলে শেরপুর জেলার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত মধুটিলা ইকোপার্ক (Madhutila Eco Park) হতে পারে আপনার একটি আদর্শ ভ্রমণ গন্তব্য। গারো পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা এই পরিবেশ-উদ্যানটি ভ্রমণপিপাসু ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। এই নিবন্ধে আমরা মধুটিলা ইকোপার্কের ইতিহাস, দর্শনীয় স্থান, যাতায়াত ব্যবস্থা, আবাসন এবং কিছু সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ) সম্পর্কে জানব।
মধুটিলা ইকোপার্ক কোথায় অবস্থিত?
মধুটিলা ইকোপার্ক বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার পোড়াগাঁও ইউনিয়নে অবস্থিত। শেরপুর জেলা শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার এবং রাজধানী ঢাকা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ২০০ কিলোমিটার। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমান্ত ঘেঁষা সমেশচূড়া ফরেস্ট বিটের পাহাড়ি এলাকায় এই পার্কটি গড়ে উঠেছে।
ইতিহাস ও নামকরণের পটভূমি
শেরপুরের উত্তর সীমান্তে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ি ঢাল ও গহীন শালবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে রক্ষা এবং পর্যটকদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করার উদ্দেশ্যে ১৯৯৯ সালে বন বিভাগের উদ্যোগে প্রায় ৩৮৩ একর পাহাড়ি জায়গা জুড়ে এই ইকোপার্কটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। স্থানীয় পাহাড়ি অঞ্চলের নাম এবং পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এর নামকরণ করা হয়েছে ‘মধুটিলা ইকোপার্ক’। কালক্রমে এটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম সেরা একটি পর্যটনকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে।
প্রধান আকর্ষণ ও দর্শনীয় স্থানসমূহ
মধুটিলা ইকোপার্কে ঘুরে দেখার এবং উপভোগ করার মতো অনেক আকর্ষণ রয়েছে:
- পর্যবেক্ষণ টাওয়ার (ওয়াচ টাওয়ার): পার্কের সবচেয়ে উঁচু পাহাড়ি টিলায় একটি সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। এর ওপর থেকে চারপাশের সবুজ অরণ্য এবং ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা পাহাড়ের সৌন্দর্য পরিষ্কার দেখা যায়।
- লেক ও প্যাডেল বোট: পার্কের ভেতরে কৃত্রিম লেক রয়েছে, যেখানে পর্যটকদের জন্য প্যাডেল বোট ও দেশীয় নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা রয়েছে।
- মিনি চিড়িয়াখানা ও শিশুপার্ক: শিশুদের বিনোদনের জন্য রয়েছে একটি ছোট শিশুপার্ক এবং বিভিন্ন পশুপাখির অবয়ব বা মিনি চিড়িয়াখানা।
- কৃত্রিম ভাস্কর্য: পার্কের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই বন্যহাতি, কুমির ও মৎস্যকন্যার চমৎকার সব বাস্তবসম্মত ভাস্কর্য চোখে পড়ে, যা পর্যটকদের আনন্দ দেয়।
- گلاب ও ঔষধি বাগান: এখানে বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধি গাছ, সৌন্দর্যবর্ধক বৃক্ষ এবং মৌসুমী ফুলের বাগান রয়েছে।

ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন (যাতায়াত ব্যবস্থা)
ঢাকা থেকে সড়কপথে খুব সহজেই মধুটিলা ইকোপার্কে যাওয়া যায়:
- বাসে যাতায়াত: ঢাকার মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন শেরপুর বা নালিতাবাড়ীগামী দূরপাল্লার বাস (যেমন: ড্রিমল্যান্ড বা অন্যান্য বাস) ছেড়ে যায়। নালিতাবাড়ী বা শেরপুর শহর থেকে সিএনজি, অটোরিকশা বা মোটরসাইকেল ভাড়া করে সরাসরি মধুটিলা ইকোপার্কে পৌঁছানো যায়।
- ব্যক্তিগত গাড়ি বা মাইক্রোবাস: পরিবার বা দলবদ্ধভাবে প্রাইভেট কার বা মাইক্রোবাস নিয়ে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ হয়ে সরাসরি মধুটিলা ইকোপার্কে চলে যাওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক।
কোথায় থাকবেন (নিকটবর্তী আবাসন ব্যবস্থা)
মধুটিলা ইকোপার্কে পর্যটকদের দিনের বেলা বিশ্রামের জন্য ‘মহুয়া রেস্টহাউস’ থাকলেও সাধারণত এখানে রাতে থাকার সুব্যবস্থা নেই। তাই রাত্রিযাপনের জন্য নিচের জায়গাগুলোতে থাকতে পারেন:
- শেরপুর জেলা সদর বা নালিতাবাড়ী: শেরপুর শহর বা নালিতাবাড়ী বাজারে সাধারণ ও মানসম্মত বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে (যেমন: হোটেল সম্পদ প্লাজা, কাকলি গেস্ট হাউজ, বর্ণালী গেস্ট হাউজ ইত্যাদি)।
- সার্কিট হাউজ বা ডাকবাংলো: সরকারি নিয়মে ও অনুমতি সাপেক্ষে শেরপুর জেলা পরিষদ বা স্থানীয় প্রশাসনের ডাকবাংলোতেও থাকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: মধুটিলা ইকোপার্ক ভ্রমণের সেরা সময় কোনটি?
উত্তর: শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) মধুটিলা ইকোপার্ক ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ সময় আবহাওয়া ঠান্ডা ও মনোরম থাকে এবং পাহাড়ে ঘোরাঘুরি করা আরামদায়ক হয়।
প্রশ্ন ২: পার্কে প্রবেশের জন্য কি কোনো টিকিট কাটতে হয়?
উত্তর: হ্যাঁ, মধুটিলা ইকোপার্কে প্রবেশের জন্য জনপ্রতি খুব সামান্য পরিমাণ (সাধারণত ২০ টাকা) প্রবেশ ফি দিতে হয়। এছাড়া ওয়াচ টাওয়ার বা রাইডের জন্য নামমাত্র টিকিট কাটতে হয়।
প্রশ্ন ৩: মধুটিলার কাছাকাছি আর কোনো দর্শনীয় স্থান আছে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, মধুটিলার খুব কাছাকাছিই শেরপুরের আরেকটি বিখ্যাত পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্র ‘গজনী অবকাশ কেন্দ্র’ অবস্থিত। হাতে সময় থাকলে একই সফরে গজনী অবকাশ থেকেও ঘুরে আসতে পারেন।



