Remma Kalenga Reserved Forest Tourist spot
Postal Code / Pin code

রেমা কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য কোথায় অবস্থিত, ইতিহাস, যাতায়াত ও ভ্রমণ নির্দেশিকা

প্রকৃতিপ্রেমী ও রোমাঞ্চপ্রিয় ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক অবিস্মরণীয় নাম রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হবিগঞ্জ (Rema-Kalenga Wildlife Sanctuary)। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করে সবুজ অরণ্যের মাঝে হারিয়ে যেতে চাইলে এটি হতে পারে আপনার পরবর্তী আদর্শ গন্তব্য। এই নিবন্ধে আমরা জানবো রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের অবস্থান, ইতিহাস, যাতায়াত ব্যবস্থা, থাকার সুব্যবস্থা এবং জরুরি কিছু তথ্য।

রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য কোথায় অবস্থিত?

রেমা–কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বাংলাদেশের একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য যা সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত। এটি একটি শুকনো ও চিরহরিৎ বন এবং সুন্দরবনের পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বনভূমি। এছাড়াও এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বণ্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এবং জীব ও উদ্ভিদবৈচিত্র্যে দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ বনাঞ্চল। রেমা–কালেঙ্গা অভয়ারণ্যের আয়তন ১৭৯৫.৫৪ হেক্টর। বাংলাদেশের যে কয়েকটি প্রাকৃতিক বনভূমি এখনো মোটামুটি ভালো অবস্থায় টিকে আছে, রেমা-কালেঙ্গা তার মধ্যে অন্যতম।

ইতিহাস ও নামকরণের পটভূমি

রেমা-কালেঙ্গা বনের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই বনাঞ্চল কাঠ আহরণ ও বন ব্যবস্থাপনার আওতাধীন ছিল। পরবর্তীতে জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী ও দুর্লভ উদ্ভিদ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ১৯৯6 সালে বন অধিদপ্তর এই এলাকাকে ‘বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে।

বনের নামটি এসেছে এর ভেতরে অবস্থিত দুটি প্রধান বিট বা এলাকার নাম মিলিয়ে— ‘রেমা’ এবং ‘কালেঙ্গা’। স্থানীয় পাহাড়ি জনপদ ও চা বাগানের আবاওয়ে গড়ে ওঠা এই বন দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল হিসেবেও পরিচিত।

রেমা-কালেঙ্গার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও আকর্ষণ

বনের মধ্যে প্রবেশের পর চোখে পড়বে অসম্ভব সুন্দর একটি লেক। লেকের চারপাশ এতই প্রাকৃতিক যে, মনেই হবে না এটা কৃত্রিম। বন্য প্রাণীদের খাবার পানির চাহিদা মেটাতেই এটি তৈরি করা হয়েছে। লেকের পাশে রয়েছে একটা ওয়াচ টাওয়ার। ইচ্ছে করলে উঠে যেতে পারবেন টাওয়ারে। ওপর থেকে পুরো বনভূমি দেখার মজাই আলাদা। যত দূরে চোখ যাবে শুধুই প্রত্যক্ষ করবেন দুর্ভেদ্য জঙ্গল।

  • উদ্ভিদবৈচিত্র্য: এই অভয়ারণ্যে ৬৩৮ প্রজাতির উদ্ভিদ, গাছ-পালা, লতা-পাতা আছে। উল্লেখযোগ্য উদ্ভিদগুলোর মধ্যে রয়েছে— আওয়াল, সেগুন, কাঁকড়, নেউড়, হারগাজা, গন্ধরই, হরীতকী, বহেরা, জাম ডুমুর, কাঠাল, চামকাঠাল, কাউ, কদম, রাতা, চিকরাশি, চাপালিশ, নিম, বনমালা ইত্যাদি।
  • প্রাণী ও পাখি: এখানে আছে ৭ প্রজাতির উভয়চর প্রাণী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ১৬৭ প্রজাতির পাখি। উল্লেখযোগ্য পাখিগুলোর মধ্যে রয়েছে— ভিমরাজ, পাহাড়ি ময়না, কাও ধনেশ, বনমোরগ, ফোটা কান্টি সাতভারলা, শ্যামা, শালিক, শামুক খাওরি, টুনটুনি ইত্যাদি। এ ছাড়া ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে, যার মধ্যে কালো বন্যশুকর, সাদা বন্যশুকর, বানর, হনুমান, মুখপোড়া হনুমান, খরগোশ, ছোট হরিণ, মেছোবাঘ, মেছোবিড়াল, বনকুকুর, রামকুত্তা উল্লেখযোগ্য। ভাগ্য ভালো থাকলে হরেক রকমের প্রাণীর দেখা পাবেন আপনি; ভিন্ন এক জগতের আবহ ভেসে উঠবে আপনার চোখের সামনে।
  • ট্রেইল বা ট্রেকিং পথ: রেমা-কালেঙ্গা অভয়াশ্রমে আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা ও তিন ঘণ্টার তিনটি ট্রেইল বা হাঁটার পথ রয়েছে। প্রতিটি পথই অত্যন্ত সুন্দর ও সাজানো। বনের ভেতরে থাকা সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ারটির মাথা বনের উঁচু উঁচু গাছগুলোর মাথা ভেদ করে আকাশে উঁকি মেরেছে, যেখান থেকে পুরো বনের দূর-দূরান্তের দৃশ্যাবলী দেখা যায়। টাওয়ারের নিচেই রয়েছে আঁকাবাঁকা একটি লেক।
  • আদিবাসী জীবনধারা: বাংলাদেশের আদিবাসী সম্প্রদায়ের জীবনধারাও দেখা যেতে পারে এখানে। রেমা-কালেঙ্গা বনের ভেতরেই ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের কয়েকটি পাড়া রয়েছে। এছাড়াও সাঁওতাল, তেলুগু ও উড়ং আদিবাসীরও বসবাস রয়েছে এই বনে।
রেমা কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য কোথায় অবস্থিত

কীভাবে যাবেন (যাতায়াত ব্যবস্থা)

রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যে মূলত দুভাবে যাওয়া যায়:

১. শায়েস্তাগঞ্জ হয়ে:

ঢাকা থেকে সিলেটগামী বাস কিংবা ট্রেনে চড়ে প্রথমে শায়েস্তাগঞ্জ নামতে হবে। বাস বাসে সায়েস্তাগঞ্জের ভাড়া আড়াইশ থেকে ৩শ’ টাকা। এছাড়া শায়েস্তাগঞ্জে থামে সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেন ‘উপবন এক্সপ্রেস’ (বুধবার ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন রাত ১০টা মিনিটে ছাড়ে, ভাড়া ১২০ থেকে ৬৭৩ টাকা)। শায়েস্তাগঞ্জ থেকে অটোরিকশা বা বেবি ট্যাক্সি চেপে কালেঙ্গা যাওয়া যায় (ভাড়া ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকা)।

২. শ্রীমঙ্গল হয়ে:

ঢাকা থেকে বাস কিংবা ট্রেনে শ্রীমঙ্গল নেমে সেখান থেকে জিপে চড়ে কালেঙ্গা যাওয়া যায়। শ্রীমঙ্গল থেকে গেলে জঙ্গলের ভেتরের দীর্ঘ পথটি ভ্রমণকারীদের বেশ ভালো লাগে।

  • বাসে: ঢাকার ফকিরাপুল ও সায়দাবাদ থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, এনা পরিবহন ইত্যাদি বাস শ্রীমঙ্গল যায় (ভাড়া সাড়ে ৩শ’ থেকে সাড়ে ৪শ’ টাকা)।
  • ট্রেনে: ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পারাবত এক্সপ্রেস (মঙ্গলবার বাদে প্রতিদিন সকাল ৬:৪০ মি.), জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস (প্রতিদিন দুপুর ২টা), উপবন এক্সপ্রেস (বুধবার বাদে প্রতিদিন রাত ৯:৫০ মি.) এবং কালনী এক্সপ্রেস (শুক্রবার বাদে প্রতিদিন বিকাল ৪টা) ছেড়ে যায়। ট্রেনের ভাড়া ১১৫ থেকে ৭৬৫ টাকা। এছাড়া চট্টগ্রাম থেকেও পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেসে শ্রীমঙ্গল যাওয়া সম্ভব।

কোথায় থাকবেন (কাছাকাছি আবাসন ব্যবস্থা)

রেমা-কালেঙ্গা বনের ভেতরে সরাসরি আধুনিক কোনো হোটেল বা রিসোর্ট নেই। তাই থাকার জন্য পর্যটকদের কাছাকাছি শহর বা এলাকায় অবস্থান করতে হয়:

  • শ্রীমঙ্গল: বনের সবচেয়ে কাছাকাছি ও জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র হলো শ্রীমঙ্গল। এখানে বাজেট থেকে শুরু করে লাক্সারি অনেক মানসম্মত রিসোর্ট, কটেজ ও হোটেল রয়েছে (যেমন: টি রিসোর্ট, গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ, নক্ষত্রবাড়ি কিংবা বিভিন্ন ইকো-কটেজ)। শ্রীমঙ্গল থেকে সকালে রওনা দিয়ে ঘুরে আবার শ্রীমঙ্গলে ফিরে রাতযাপন করা যায়।
  • হবিগঞ্জ জেলা সদর বা শায়েস্তাগঞ্জ: প্রয়োজনে শায়েস্তাগঞ্জ বা হবিগঞ্জ শহরে সাধারণ মানের আবাসিক হোটেলেও রাত্রিযাপন করা সম্ভব।
  • বন বিভাগের ডাকবাংলো: অনুমতি সাপেক্ষে কালেঙ্গা বন বিট অফিসে কখনও কখনও থাকার ব্যবস্থা পাওয়া যেতে পারে, তবে এর জন্য আগে থেকেই বন বিভাগের সাথে যোগাযোগ করা নিরাপদ।
Remma Kalenga Reserved Forest

সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: রেমা-কালেঙ্গা যাওয়ার সেরা সময় কোনটি?

উত্তর: শীতকাল (নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি) রেমা-কালেঙ্গা ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। এ সময় আবহাওয়া অনুকূলে থাকে এবং বনের ভেতর সহজে ট্র্যাকিং করা যায়। এছাড়া শীতে অনেক পরিযায়ী পাখিরও দেখা মেলে।

প্রশ্ন ২: বনে কি একা প্রবেশ করা নিরাপদ?

উত্তর: একা ঘন জঙ্গলে প্রবেশ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বনের ভেতর রাস্তা হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে, তাছাড়া বন্যপ্রাণীও রয়েছে। তাই স্থানীয় গাইড বা বনকর্মীর সহায়তা নিয়ে দলবদ্ধভাবে ট্রেইলগুলোতে হাঁটা উচিত।

প্রশ্ন ৩: ভ্রমণের সময় কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত?

উত্তর: বনে প্লাস্টিক বা পলিথিন ফেলা থেকে বিরত থাকুন, যা বন্যপ্রাণীর ক্ষতি করতে পারে। এছাড়া আরামদায়ক হাঁটার জুতো, পর্যাপ্ত পানি, হালকা শুকনো খাবার এবং জোঁক বা পোকামাকড় থেকে বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সাথে রাখা জরুরি।

Leave a Reply