প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় এবং সুন্দর একটি গন্তব্য হলো সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান (Satchari National Park)। আপনি যদি যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করে সবুজ অরণ্য, পাখির কলকাকলি এবং বন্যপ্রাণীর সান্নিধ্যে একটি দিন কাটাতে চান, তবে সাতছড়ি হতে পারে আপনার সেরা পছন্দ। আজকের এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান কোথায় অবস্থিত, এর ইতিহাস, ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন, আশেপাশের থাকার জায়গা এবং কিছু সাধারণ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান কোথায় অবস্থিত?
“সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান কোথায় অবস্থিত?” — এই প্রশ্নটি ভ্রমণপিপাসুদের মনে প্রায়ই আসে। হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার রঘুনন্দন পাহাড়ে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান অবস্থিত। এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান একটি প্রাকৃতিক উদ্যান, যা জীববৈচিত্র্যে ভরপুর।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ইতিহাস ও পটভূমি
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ/সংশোধন আইনের বলে ২৪৩ হেক্টর এলাকা নিয়ে ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠা করা হয়। অতীতে এই বনের নাম ছিল “রঘুনন্দন হিল রিজার্ভ ফরেস্ট”।
এই উদ্যানের নামকরণের পেছনে একটি আকর্ষণীয় ইতিহাস রয়েছে। এই উদ্যানে মোট সাতটি পাহাড়ি ছড়া বা ঝিরি রয়েছে, সেই থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে “সাতছড়ি”।
জাতীয় উদ্যানটি কয়েকটি চা বাগান, গ্রাম, শহর এবং চাষাবাদকৃত জমি দ্বারা নিবিড়ভাবে বেষ্টিত। সাতছড়ি উদ্যানের কাছাকাছি ৯টি চা বাগান রয়েছে। উদ্যানের পশ্চিম দিকে সাতছড়ি চা বাগান এবং পূর্ব দিকে চাকলাপুঞ্জি চা বাগান অবস্থিত। টিপরাপাড়া নামে একটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর গ্রাম উদ্যানটির ভেতরে অবস্থিত, যেখানে ২৪টি আদিবাসী পরিবার বসবাস করে।
উদ্ভিদ ও প্রাণী বৈচিত্র্য
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে রয়েছে ১৪৫ প্রজাতির গাছপালা ছাড়াও ১৯৭ প্রজাতির জীব। এর মধ্যে রয়েছে:
- পাখি: ১৪৯ প্রজাতির পাখি (যেমন: ধনেশ, লাল মাথা ট্রগন)।
- স্তন্যপায়ী: ২৪ প্রজাতির স্তন্যপায়ী (যেমন: উল্লুক, মেছোবাঘ, শুকুর, মুখপোড়া হনুমান, চশমা হনুমান, লজ্জাবতী বানর)।
- অন্যান্য: ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৬ প্রজাতির উভচর প্রাণী।
বনের উল্লুকগুলোর এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফালাফি এবং পোকামাকড়ের বিচিত্র ধরনের ঝিঁঝিঁ শব্দ পর্যটকদের মনে দারুণ আনন্দের সৃষ্টি করে। তবে দুঃখের বিষয় হলো, বন থেকে চিতা বাঘ, মেছো বাঘ, মায়া হরিণ, ময়না ও টিয়া পাখির মতো প্রায় ২০ প্রজাতির বন্যপ্রাণী আজ কালের আবর্তে হারিয়ে যেতে বসেছে।

ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন?
ঢাকা থেকে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে খুব সহজেই যাতায়াত করা সম্ভব। নিচে যাতায়াতের মাধ্যমগুলো দেওয়া হলো:
১. বাসে যাতায়াত: ঢাকা থেকে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ মাধ্যম হলো সিলেটগামী যে কোনও বাসে উঠে মাধবপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে নেমে পড়া। সেখান থেকে বাস কিংবা ম্যাক্সিতে করে সরাসরি সাতছড়ি পৌঁছানো যায়। এছাড়া ঢাকার সায়দাবাদ থেকে অগ্রদূত পরিবহন, দিগন্ত পরিবহন ও বিসমিল্লাহ পরিবহন সরাসরি হবিগঞ্জ চলাচল করে। এসি বাসের ভাড়া সাধারণত ২৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
২. ট্রেনে যাতায়াত: ট্রেনে ভ্রমণ করতে চাইলে ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে যেতে পারেন। ঢাকা থেকে ট্রেন বা বাসে হবিগঞ্জ গেলে প্রথমে সায়েস্তাগঞ্জ স্টেশনে নামতে হবে (শহর থেকে দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার)।
- ঢাকার কমলাপুর স্টেশন থেকে মঙ্গলবার বাদে প্রতিদিন সকাল ৬:৪০ মিনিটে পারাবত এক্সপ্রেস, দুপুর ২টায় জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস এবং বুধবার বাদে রাত ১০টায় উপবন এক্সপ্রেস ছেড়ে যায়। শ্রেণীভেদে এর ভাড়া ১০০ থেকে ৬৭৩ টাকা।
- চট্টগ্রাম থেকে পাহাড়িকা এক্সপ্রেস (সোমবার বাদে সকাল ৮:১৫ মিনিটে) এবং উদয়ন এক্সপ্রেস (শনিবার বাদে রাত ৯টায়) ছেড়ে যায়। ভাড়া ১২৫ থেকে ৮৫৭ টাকা।
হবিগঞ্জ সদর থেকে যেতে চাইলে হবিগঞ্জ টু মাধবপুর ভায়া চুনারুঘাট বাসে অথবা সিএনজি বা মাইক্রোবাস রিজার্ভ করে সাতছড়ি যাওয়া যায়। উদ্যানের তথ্য কেন্দ্র থেকে গাইড নিতে পারেন (গাইড ফি ২০০-৫০০ টাকা)। যদিও অফিস চত্বরে ম্যাপ দেওয়া থাকে, তবুও বনের ভেতরে পথ ভুল এড়াতে গাইড নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
হবিগঞ্জে কোথায় থাকবেন (কাছাকাছি আবাসন ব্যবস্থা)
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের একদম ভেতরে কিংবা খুব কাছে উন্নতমানের বড় কোনো হোটেল বা রিসোর্ট নেই। তাই থাকার জন্য পর্যটকরা সাধারণত নিচের জায়গাগুলো বেছে নেন:
- শ্রীমঙ্গল: সাতছড়ি উদ্যানের খুব কাছেই পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গল অবস্থিত। এখানে বাজেট থেকে শুরু করে লাক্সারি বিভিন্ন ধরণের ভালো মানের হোটেল, রিসোর্ট এবং কটেজ রয়েছে।
- হবিগঞ্জ সদর বা সায়েস্তাগঞ্জ: আপনি যদি হবিগঞ্জ শহর বা সায়েস্তাগঞ্জে থাকতে চান, তবে সেখানে সাধারণ মানের কিছু আবাসিক হোটেল পেয়ে যাবেন।
- চা বাগান বাংলো: পূর্বানুম সাপেক্ষে বা স্থানীয় যোগাযোগের মাধ্যমে অনেক সময় চা বাগানের গেস্ট হাউসেও থাকার সুযোগ মিলতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসित প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান কোথায় অবস্থিত? উত্তর: সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার রঘুনন্দন পাহাড়ে অবস্থিত।
২. সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের আগের নাম কী ছিল? উত্তর: সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের আগের নাম ছিল “রঘুনন্দন হিল রিজার্ভ ফরেস্ট”।
৩. উদ্যানের নামকরণ “সাতছড়ি” হলো কেন? উত্তর: এই বনে মোট সাতটি পাহাড়ি ছড়া বা ঝিরি থাকার কারণে এর নাম রাখা হয়েছে সাতছড়ি।
৪. সাতছড়ির ভেতরে কি কোনো গ্রাম আছে? উত্তর: হ্যাঁ, উদ্যানের ভেতরে ‘টিপরাপাড়া’ নামক একটি গ্রামে ২৪টি আদিবাসী উপজাতি পরিবার বসবাস করে।
৫. বনের ভেতর কি গাইড নেওয়া জরুরি? উত্তর: বনের ট্রেইলে পথ হারানোর ঝুঁকি থাকে, তাই তথ্যকেন্দ্র থেকে একজন স্থানীয় গাইড (ফি ২০০-৫০০ টাকা) সঙ্গে নেওয়া নিরাপদ ও ভালো সিদ্ধান্ত।



