লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার
Bangladesh - Moulvibazar

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার: ইতিহাস, যাতায়াত, কোথায় থাকবেন এবং সাধারণ জিজ্ঞাসা

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্য প্রকৃতি, চিরসবুজ রেইনফরেস্ট এবং জীববৈচিত্র্যের এক অপার ভাণ্ডার হলো লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল উপজেলাজুড়ে বিস্তৃত এই সংরক্ষিত বনাঞ্চল দেশের অন্যতম প্রধান এবং জনপ্রিয় একটি পর্যটন কেন্দ্র। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই উদ্যানটি ভ্রমণপিপাসু ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এক অপূর্ব রূপকথার জগত।

১. ইতিহাস ও ভৌগোলিক পরিচয়

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পটভূমি ও এর পরিবেশগত গুরুত্ব অত্যন্ত সুদূর প্রসারী:

  • সংরক্ষণ ও প্রতিষ্ঠা: ব্রিটিশ আমলে ১৯২৬ সালে এই বনাঞ্চলের একাংশে চা বাগান সৃষ্টির জন্য গাছ কেটে রোপণ করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ‘ওয়েস্ট ভানহুগাছ সংরক্ষিত বন’ হিসেবে পরিচিত হয়। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ সরকার এর ১২৫০ হেক্টর (প্রায় ৩,০৮৮ একর) এলাকাকে জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও পর্যটনের বিকাশের জন্য ‘লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান’ হিসেবে ঘোষণা করে। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের ৭টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান।
  • নামকরণ ও লোককথা: স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, একসময় এই বনের ভেতর দিয়ে প্রচুর লাউ বা লাউয়ের ফলন বা লতাগুল্ম ছিল কিংবা অতীতে এখানে পাহাড়ি ঢলে লাউ ভেসে যাওয়ার ঘটনা থেকে এর নাম ‘লাউয়াছড়া’ হয়েছে বলে প্রবীণরা মনে করেন।

২. মূল আকর্ষণ ও দেখার মতো বিষয়সমূহ

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান যেন একটি জীবন্ত প্রাকৃতিক জাদুঘর। এখানে দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে দেখার মতো অনেক কিছু:

  • বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য: জাতীয় তথ্যকোষ অনুযায়ী, এই উদ্যানে প্রায় ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে ১৬০ প্রজাতির উদ্ভিদ, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৪০ প্রজাতির পাখি এবং ৬ প্রজাতির সরীসৃপ। হরিণ, লজ্জাবতী বানর, মুখপোড়া হনুমান, সজারু, অজগর সাপ, গুইসাপ, মেছোবাঘসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী এখানে বসবাস করে।
  • উল্লুকের নিরাপদ আশ্রয়: লাউয়াছড়া উদ্যানটি বিশ্বজুড়ে বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের (Hoolock Gibbon) সবচেয়ে বড় ও নিরাপদ বিচরণ এলাকা হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। বনের ডালে ডালে উল্লুকের মিতালী ও তাদের ডাক এখানকার প্রধান আকর্ষণ।
  • ট্রেকিং ট্রেইল: বনের গভীর সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য এখানে তিনটি প্রধান ট্রেইল রয়েছে—আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টা এবং তিন ঘণ্টার ট্রেইল। গাইড সাথে নিয়ে এই ট্রেইলগুলোতে ট্রেকিং করার অভিজ্ঞতা রোমাঞ্চকর। আলো-আধারের খেলা, পাখির কিচিরমিচির আর ঝিঁঝি পোকার শব্দ এক অদ্ভুত জাদুকরী পরিবেশ তৈরি করে।
  • রেললাইন ও অন্যান্য আকর্ষণ: লাউয়াছড়া বনের ঠিক বুক চিরে চলে গেছে ঐতিহাসিক ঢাকা-সিলেট রেললাইন, যার দুপাশের সবুজ পাতার ছাদ পর্যটকদের দারুণভাবে আকর্ষণ করে। এছাড়া বনের ভেতরে খাসিয়াপুঞ্জি, পানের বরজ, এবং চারপাশের সবুজ চা-বাগান ও উঁচু-নিচু টিলা এই স্থানটির সৌন্দর্য বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

৩. ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সড়ক ও রেলপথে খুব সহজেই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে যাতায়াত করা যায়:

ট্রেনযোগে যাতায়াত:

  • ঢাকা কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা, উপবন বা কালনী এক্সপ্রেস ট্রেনে করে সরাসরি শ্রীমঙ্গল স্টেশনে নামা যায়। ট্রেন যাত্রা অত্যন্ত আরামদায়ক ও জনপ্রিয়। শ্রীমঙ্গল স্টেশন থেকে সিএনজি বা লোকাল যানবাহনে মাত্র ১০-১৫ মিনিটেই লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে পৌঁছানো যায়।

বাসযোগে যাতায়াত:

  • ঢাকার ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ বা মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, এনা পরিবহন কিংবা সিলেট এক্সপ্রেসের বাসে সরাসরি শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। শ্রীমঙ্গল বাস স্ট্যান্ড বা চৌমুহনা থেকে সিএনজি, অটোরিকশা বা লোকাল গাড়িতে করে লাউয়াছড়ায় যাওয়া খুব সহজ।

৪. শ্রীমঙ্গলে কোথায় থাকবেন

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের একদম কাছাকাছি বা শ্রীমঙ্গল উপজেলা সদরে সব বাজেটেই থাকার চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে:

  • বাজেট আবাসিক হোটেল: শ্রীমঙ্গল শহর ও চৌমুহনা এলাকায় সাধারণ ও মাঝারি বাজেটের বেশ কিছু ভালো মানের আবাসিক হোটেল (যেমন: হোটেল প্লাজা, হোটেল নিসর্গ, হোটেল মিডটাউন ইত্যাদি) রয়েছে।
  • ইকো-রিসোর্ট ও কটেজ: আপনি যদি প্রকৃতির কাছাকাছি কোনো রিসোর্টে থাকতে চান, তবে শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়ার আশেপাশেই বেশ কিছু সুন্দর ইকো-রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে, যেখানে গ্রামীণ আবহে রাত কাটানো যায়।
  • লাক্সারি রিসোর্ট: একটু প্রিমিয়াম ও বিলাসবহুল অভিজ্ঞতার জন্য শ্রীমঙ্গলের বিশ্বমানের রিসোর্ট যেমন—গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ, নৃত্যশিল্পী রিসোর্ট, নভেম রিসোর্ট ইত্যাদিতে আগে থেকেই বুকিং করে থাকতে পারেন।

৫. সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান পরিদর্শনের উপযুক্ত সময় কোনটি?

উত্তর: বছরের যেকোনো সময়ই এখানে যাওয়া যায়। তবে শীতকাল (অক্টোবর থেকে মার্চ) আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং বনের ভেতরে স্বাচ্ছন্দ্যে ট্রেকিং করার জন্য সবচেয়ে সেরা সময়।

প্রশ্ন ২: উদ্যানে প্রবেশের জন্য কি কোনো টিকিট বা প্রবেশমূল্য লাগে?

উত্তর: হ্যাঁ, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশ বন বিভাগের নির্ধারিত প্রবেশমূল্য বা টিকিট সংগ্রহ করতে হয়।

প্রশ্ন ৩: বনের ভেতরে ঘোরার জন্য কি গাইডের প্রয়োজন হয়?

উত্তর: বনের ভেতরের ট্রেইলগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে এবং বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ সুরক্ষার সঠিক নিয়ম মেনে চলতে মূল গেট থেকে একজন নিবন্ধিত স্থানীয় গাইড সাথে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

প্রশ্ন ৪: লাউয়াছড়া ভ্রমণের সময় কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত?

উত্তর: বনের ভেতরে প্লাস্টিক বা পলিথিন ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া বন্যপ্রাণী বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকা, নিরিবিলি পরিবেশ বজায় রাখা এবং জোঁক ও পোকামাকড় থেকে সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত জুতো ও পোশাক পরা উচিত।

Leave a Reply