মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার গভীর বনের অন্দরে লুকিয়ে থাকা অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো হামহাম জলপ্রপাত (Ham Ham Waterfall)। রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের দুর্গম পাহাড়, ঝিরিপথ ও গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে হেঁটে আবিষ্কার করতে হয় প্রায় ১৪০ ফুট উঁচু এই ঝর্ণাটি। যারা একটু রোমাঞ্চকর ও ট্র্যাকিংয়ের অভিজ্ঞতা পছন্দ করেন, তাদের জন্য হামহাম জলপ্রপাত এক নিখুঁত গন্তব্য।
১. ইতিহাস ও নামকরণের ইতিহাস
হামহাম জলপ্রপাতের আবিষ্কারের ইতিহাস ও এর স্থানীয় পরিচয় বেশ আকর্ষণীয়:
- আবিষ্কারের ইতিহাস: মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গভীরে ২০১০ সালের শেষের দিকে পর্যটন গাইড শ্যামল দেববর্মার সাথে একদল পর্যটক হাম হাম ঝর্ণাটি আবিষ্কার করেন। এর আগে বনের গভীরতা ও দুর্গমতার কারণে বাইরের দুনিয়ার খুব কম মানুষই এই জলপ্রপাতের সন্ধান জানত। আবিষ্কারের পর থেকেই এটি বাংলাদেশের ট্রেকার ও নেচার লাভারদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
- স্থানীয় নাম ও বৈশিষ্ট্য: স্থানীয় পাহাড়ি ও গ্রামবাসী এই ঝর্ণাকে ‘চিতা ঝর্ণা’ বলে ডাকেন। তাদের মতে, একসময় এই গভীর জঙ্গলে প্রচুর চিতা বাঘের বিচরণ ছিল। প্রায় ১৪০ ফুট ওপর থেকে গড়িয়ে পড়া এই ঝর্ণার বন্য ও আদিম সৌন্দর্য দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে বহু মানুষ এখানে ছুটে আসেন। তবে শীতকালে জলপ্রপাতে পানির প্রবাহ কিছুটা কমে যাওয়ায়, বর্ষাকালে এর প্রকৃত ও ভয়ংকর সুন্দর রূপ দেখতে পাওয়া যায়।

২. ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে হামহাম জলপ্রপাতে পৌঁছানোর জন্য প্রথমে আপনাকে মৌলভীবাজারের পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গলে পৌঁছাতে হবে:
ট্রেন বা বাসে যাতায়াত (ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল):
- ট্রেনে: ঢাকা কমলাপুর বা বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে পারাবত, জয়ন্তিকা বা উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে করে সরাসরি শ্রীমঙ্গলে আসা যায়। সিট ও শ্রেণিভেদে ট্রেনের ভাড়া সাধারণত ২৪০ থেকে ৮২৮ টাকার মতো হয়ে থাকে। সময় লাগে প্রায় ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা।
- বাসে: ঢাকার ফকিরাপুল, সায়দাবাদ বা মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে হানিফ এন্টারপ্রাইজ, শ্যামলী পরিবহন, সিলেট এক্সপ্রেস, এনা পরিবহনের মতো মানসম্মত বাসে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। বাসের টিকিটের মূল্য সাধারণত ৫৭০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে হয় এবং সময় লাগে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা।
শ্রীমঙ্গল থেকে হামহাম ঝর্ণা:
- কলাবন পাড়া পর্যন্ত যাত্রা: শ্রীমঙ্গল থেকে সকাল সকাল রওনা দেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। শহর থেকে সিএনজি বা জিপ ভাড়া করে প্রথমে কলাবন পাড়ায় (ঝর্ণার ট্রেইলের শুরু বা গেটওয়ে) পৌঁছাতে হবে। সিএনজি ভাড়া সাধারণত ১,০০০ থেকে ১,২০০ টাকার মতো হয় (এক গাড়িতে ৩ থেকে ৫ জন যাওয়া যায়)।
- ট্রেকিং ও গাইড: কলাবন পাড়ায় পৌঁছানোর পর বনের ভেতরে পথ হারানোর ঝুঁকি এড়াতে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বিনিময়ে একজন স্থানীয় গাইড সাথে নেওয়া বাধ্যতামূলক ও জরুরি। হাঁটার সুবিধার জন্য বাঁশের লাঠি সাথে রাখা এবং বনের মধ্যে জোঁকের উপদ্রব থেকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কলাবন পাড়া থেকে পাহাড়ি পথ ও ঝিরি ধরে হেঁটে হামহাম পৌঁছাতে সাধারণত ২ থেকে ৩ ঘণ্টা বা তার বেশি সময় লাগতে পারে।
৩. শ্রীমঙ্গলে ও কাছাকাছি কোথায় থাকবেন
হামহাম জলপ্রপাতের একদম কাছাকাছি গভীর জঙ্গলে বা কলাবন পাড়ায় রাত্রিযাপনের কোনো আধুনিক আবাসিক ব্যবস্থা নেই। তাই পর্যটকদের জন্য শ্রীমঙ্গল উপজেলা সদরে থাকাটাই সবচেয়ে নিরাপদ ও সুবিধাজনক:
- শ্রীমঙ্গলের হোটেল ও রিসোর্ট: শ্রীমঙ্গল শহরে সব বাজেটেই থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে। বাজেট ট্রাভেলারদের জন্য শহরের ভেতরে বেশ কিছু ভালো মানের আবাসিক হোটেল (যেমন: হোটেল প্লাজা, হোটেল মিডটাউন ইত্যাদি) রয়েছে।
- লাক্সারি রিসোর্ট ও কটেজ: আপনি যদি প্রকৃতির মাঝে একটু প্রিমিয়াম বা আরামদায়ক অভিজ্ঞতা চান, তবে শ্রীমঙ্গলের গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ, টি টাউন রেস্টহাউজ বা স্থানীয় বিভিন্ন ইকো-কটেজে আগে থেকেই বুকিং করে থাকতে পারেন। সেখান থেকে সকালে সিএনজি নিয়ে হামহামের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া সহজ হয়।
৪. সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: হামহাম জলপ্রপাত পরিদর্শনের উপযুক্ত সময় কোনটি?
উত্তর: বর্ষাকাল বা তার ঠিক পরের সময়গুলো (বর্ষা থেকে শরৎকাল) হামহাম ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে সেরা, কারণ তখন ঝর্ণায় পর্যাপ্ত পানি থাকে এবং এর প্রকৃত রূপ দেখা যায়। শীতকালে ঝর্ণায় পানি অনেক কমে যায়।
প্রশ্ন ২: হামহাম ট্রেইলে যাওয়ার জন্য কি গাইডের প্রয়োজন হয়?
উত্তর: হ্যাঁ, রাজকান্দি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পথ অত্যন্ত জটিল ও গভীর জঙ্গল হওয়ায় স্থানীয় গাইড ছাড়া যাওয়া একেবারেই নিরাপদ নয়। কলাবন পাড়া থেকে অবশ্যই একজন গাইড সাথে নিয়ে নেওয়া উচিত।
প্রশ্ন ৩: ট্রেকিংয়ের সময় কী কী প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি?
উত্তর: পাহাড়ি ও পিচ্ছিল ঝিরিপথে হাঁটার জন্য ভালো গ্রিপের কেডস বা ট্রেকিং জুতো, হালকা পোশাক, পর্যাপ্ত পানি, শুকনা খাবার, ফার্স্ট এইড এবং জোঁক থেকে বাঁচার জন্য লবণ বা কয়েল সাথে রাখা জরুরি।
প্রশ্ন ৪: হামহাম যাওয়ার জন্য কি কোনো বিশেষ অনুমতির প্রয়োজন হয়?
উত্তর: সাধারণত বনাঞ্চলে প্রবেশের জন্য স্থানীয় গাইড বা বন বিভাগের নিয়মানুযায়ী এন্ট্রি বা গাইড ফি দিতে হতে পারে। ভ্রমণের দিন স্থানীয়ভাবে এই বিষয়ে আপডেট জেনে নেওয়া ভালো।



