বরেণ্য চিত্র শিল্পী এসএম সুলতানের সমাধি
Bangladesh - Narail

বরেণ্য চিত্র শিল্পী এসএম সুলতানের সমাধি

বাংলার মাটি, মানুষ ও গ্রামীণ জনপদের জীবনসংগ্রামকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা বিশ্বখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান (শেখ মোহাম্মদ সুলতান)-এর জন্মভূমি ও চিরনিদ্রার স্থান নড়াইল জেলা। চিত্রা নদীর তীরে অবস্থিত তাঁর সমাধি এবং স্মৃতি কমপ্লেক্সটি কেবল শিল্পপ্রেমীদের জন্যই নয়, বরং বাংলাদেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হওয়ার এক অনন্য তীর্থস্থান। গ্রামীণ আবহাওয়া ও শিল্পীর সৃষ্টিশীলতার ছোঁয়াধন্য এই স্থানটি দর্শনার্থীদের মনে গভীর ছাপ ফেলে।

১. ইতিহাস ও সমাধি সংক্রান্ত তথ্য

এস এম সুলতানের জীবন, শিল্পকর্ম এবং তাঁর অন্তিম শয়নের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবোজ্জ্বল ও অনুপ্রেরণাদায়ক:

  • জন্ম ও শিল্পসাধনা: এস এম সুলতান ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল সদর উপজেলার মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গণ্ডি পেরিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে বাংলার খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষক, জেলে এবং গ্রামীণ জীবনকে অসাধারণ মুন্সিয়ানায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন। তাঁর চিত্রকর্মে বাংলার শ্রমজীবী মানুষের পেশীশক্তি ও কর্মচাঞ্চল্য এক অনন্য রূপ লাভ করেছিল।
  • মৃত্যু ও দাফন: ১৯৫৪ সালের পর দীর্ঘকাল লোকচক্ষুর অন্তরালে কাটিয়ে শেষ বয়সে তিনি নড়াইলেই ফিরে আসেন এবং শিশুদের জন্য চারুপিঠ ও লাল মিয়া নামে নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (CMH) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাঁকে নড়াইলের কুড়িগ্রাম-মাছিমদিয়া এলাকার নিজ বাড়ির উত্তর পাশে পরম শ্রদ্ধায় সমাহিত করা হয়।
  • এস এম সুলতান স্মৃতি কমপ্লেক্স: শিল্পীর স্মৃতি সংরক্ষণে তাঁর নিজ বাড়িতে গড়ে তোলা হয়েছে ‘এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা ও কমপ্লেক্স’। এখানে তাঁর আঁকা বহু দুর্লভ ও বিখ্যাত চিত্রকর্ম, ব্যবহার্য বিভিন্ন সামগ্রী এবং তাঁর জীবনের নানা স্মারক সযত্নে সংরক্ষিত আছে, যা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে।
বরেণ্য চিত্র শিল্পী এসএম সুলতানের সমাধি

২. ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন

চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের সমাধি ও স্মৃতি কমপ্লেক্স দেখতে চাইলে আপনাকে ঢাকা থেকে সড়কপথে নড়াইল সদরে পৌঁছাতে হবে:

সড়কপথ (বাসে যাতায়াত):

  • পথ ও দূরত্ব: ঢাকা থেকে সড়কপথে (পদ্মা সেতু হয়ে অথবা পাটুরিয়া/দৌলতদিয়া ফেরি পার হয়ে) নড়াইল সদরের দূরত্ব প্রায় ৩১০ কিলোমিটার।
  • বাস নির্বাচন: ঢাকার গাবতলী, কলাবাগান, সায়েদাবাদ বা আবদুল্লাহপুর থেকে নড়াইলগামী বিভিন্ন মানসম্মত এসি ও নন-এসি বাস (যেমন: হানিফ এন্টারপ্রাইজ, গোল্ডেন লাইন, ঈগল পরিবহন ইত্যাদি) নিয়মিত চলাচল করে। পদ্মা সেতু চালুর ফলে বর্তমানে যাতায়াত আরও অনেক সহজ ও দ্রুততর হয়েছে।
  • সময় ও ভাড়া: ঢাকা থেকে নড়াইল পৌঁছাতে সাধারণত ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। বাসের টিকিটের মূল্য মানভেদে ৬০০ থেকে ১,৪০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। নড়াইল সদর বাস টার্মিনাল বা শহর থেকে রিকশা কিংবা ইজিবাইকযোগে সরাসরি চিত্রা নদীর তীরে অবস্থিত এসএম সুলতান কমপ্লেক্সে পৌঁছে যাওয়া যায়।

৩. নড়াইলে কোথায় থাকবেন

এস এম সুলতান কমপ্লেক্স বা নড়াইলের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার জন্য রাত্রিযাপনের ক্ষেত্রে নড়াইল জেলা সদরকেই মূল ঘাঁটি হিসেবে বেছে নেওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক। নড়াইল সদরে বেশ কিছু ভালো মানের আবাসিক হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে:

১. হোটেল রূপালী (Hotel Rupali):

  • অবস্থান: চৌরঙ্গী মোড়, নড়াইল সদর।
  • বৈশিষ্ট্য: এটি নড়াইল শহরের অন্যতম পরিচিত ও মানসম্মত আবাসিক হোটেল। এখানে সাশ্রয়ী মূল্যে এসি ও নন-এসি রুমের সুব্যবস্থা রয়েছে।

২. সার্কিট হাউস ও ভিআইপি ডাকবাংলো:

  • সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে বা প্রশাসনিক নিয়মে নড়াইলের জেলা পরিষদ ডাকবাংলো কিংবা সার্কিট হাউসেও থাকার সুযোগ রয়েছে।

৩. অন্যান্য বাজেট হোটেল:

  • নড়াইল নতুন বাস টার্মিনাল ও রূপগঞ্জ বাজার সংলগ্ন এলাকায় আরও কিছু সাধারণ মানের আবাসিক হোটেল রয়েছে, যেখানে পর্যটকরা সহজেই রাত কাটাতে পারেন।

৪. সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: এসএম সুলতানের সমাধি ও কমপ্লেক্স পরিদর্শনের উপযুক্ত সময় কোনটি?

উত্তর: বছরের যেকোনো সময়ই এখানে যাওয়া যায়। তবে শীতকাল (অক্টোবর থেকে মার্চ) আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং চিত্রা নদীর তীরবর্তী পরিবেশ উপভোগ করার জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময়।

প্রশ্ন ২: স্মৃতি কমপ্লেক্সে প্রবেশের জন্য কি কোনো টিকিট বা প্রবেশমূল্য লাগে?

উত্তর: এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা ও কমপ্লেক্সে প্রবেশের জন্য সাধারণত সামান্য প্রবেশমূল্য বা টিকিট রয়েছে, যা দিয়ে কমপ্লেক্সের রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়।

প্রশ্ন ৩: নড়াইলে খাওয়ার জন্য ভালো কোনো হোটেল বা রেস্তোরাঁ আছে কি?

উত্তর: নড়াইল শহর সদরে এবং রূপগঞ্জ বাজারে বেশ কিছু ভালো মানের খাবার হোটেল ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে, যেখানে ঐতিহ্যবাহী খাবার ও সাধারণ বাঙালি খাবার পাওয়া যায়।

প্রশ্ন ৪: শিল্পীর সমাধির পাশাপাশি নড়াইলে দেখার মতো আর কী কী আছে?

উত্তর: চিত্রা নদীর সুন্দর পাড়, লোহাগড়ার নলদীর জমিদার বাড়ি, বাধাঘাট এবং জেলার বিভিন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান ভ্রমণপিপাসুরা ঘুরে দেখতে পারেন।

Leave a Reply