মাগুরা জেলা শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণ কোণে মাগুরা-নড়াইল সড়কের পার্শ্ববর্তী শত্রুজিৎপুর গ্রামে নবগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত মদনমোহন মন্দির বাংলার প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের এক অপূর্ব নিদর্শন। সবুজে ঘেরা এক শান্ত ও স্নিগ্ধ পরিবেশে নদীর তীরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক মন্দিরটি ধর্মপ্রাণ পুণ্যার্থী ও ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি স্থান।
১. ইতিহাস ও পটভূমি
মদনমোহন মন্দির এবং এর আশপাশের এলাকার ইতিহাস মুঘল আমলের গোড়ার দিকে এবং বাংলার বারো ভূঁইয়ার ইতিহাসের সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত:
- রাজা সত্রাজিৎ ও শত্রুজিৎপুর নামকরণ: মাগুরা সদর উপজেলার অন্তর্গত সত্রাজিৎপুর বা শত্রুজিৎপুর ইউনিয়ন একটি অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী জনপদ। বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম ভূষণার অধিপতি মুকুন্দ রায়ের পুত্র রাজা সত্রাজিৎ রায় ১৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে শত্রুজিৎপুর এসে এখানে রাজধানী স্থাপন করেন এবং সেখান থেকে তাঁর রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। তাঁর নামানুসারেই এই অঞ্চলের নামকরণ হয় সত্রাজিৎপুর বা শত্রুজিৎপুর।
- রাজবংশের পতন ও বংশধরদের ইতিহাস: পরবর্তী সময়ে মুঘল শাসকদের সাথে সংঘাতে রাজা সত্রাজিৎ রায় প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হন। রাজার এই করুণ মৃত্যুর পর তাঁর বংশের রাজগৌরব ও স্বাধীনতা চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়। রাজা সত্রাজিৎ রায়ের উত্তরাধিকারী কৃষ্ণপ্রসাদ বরাট, তৎকালীন গোষ্ঠীপতি রাম হরি গুহ রায়ের কন্যা সরস্বতী দেবীকে বিবাহ করেন। পরবর্তীতে রামহরির পুত্র রঘুদেব গুহকে তরফ কুজবাড়িয়ার অধীন জয়পুর গ্রাম মহাত্রাণ দান করে সেখানে তাঁর বাসস্থান নির্মাণ করে দেওয়া হয়। তবে রঘুদেব গুহ পরবর্তীতে প্রায়ই সত্রাজিৎপুরের বাড়িতেই বসবাস করতেন।
- মদনমোহন মন্দিরের প্রতিষ্ঠা: এই প্রাচীন জনপদের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় নবগঙ্গা নদীর তীরে শ্রী শ্রী মদনমোহন জিউর এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা শত শত বছর ধরে এই অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উপাসনালয় ও আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে।

২. ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন
মাগুরার শত্রুজিৎপুর গ্রামে অবস্থিত মদনমোহন মন্দির দেখতে চাইলে প্রথমে আপনাকে রাজধানী ঢাকা থেকে সড়কপথে মাগুরা জেলা সদরে পৌঁছাতে হবে:
সড়কপথ (বাসে যাতায়াত):
- বাস নির্বাচন: ঢাকার গাবতলী, কলাবাগান, সায়েদাবাদ বা কল্যাণপুর বাস টার্মিনাল থেকে মাগুরা বা খুলনাগামী বিভিন্ন মানসম্মত এসি ও নন-এসি বাস (যেমন: হানিফ এন্টারপ্রাইজ, গোল্ডেন লাইন, ঈগল পরিবহন ইত্যাদি) নিয়মিত চলাচল করে। পদ্মা সেতু হয়ে এই বাসগুলোতে খুব সহজেই মাগুরায় পৌঁছানো যায়।
- ভাড়া ও সময়: ঢাকা থেকে মাগুরা পৌঁছাতে সাধারণত ৫ থেকে ৫.৫ ঘণ্টা সময় লাগে। বাসের টিকিটের মূল্য মানভেদে ৬০০ থেকে ১,৩০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
মাগুরা থেকে শত্রুজিৎপুর মন্দির:
- মাগুরা জেলা শহর থেকে মাগুরা-নড়াইল সড়ক ধরে প্রায় ১৪ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণ কোণে শত্রুজিৎপুর গ্রামে এই মন্দির অবস্থিত।
- মাগুরা নতুন বাস টার্মিনাল বা শহর থেকে লোকাল বাস, টেম্পু, সিএনজি কিংবা ইজিবাইকে করে সহজেই শত্রুজিৎপুর বাজারে পৌঁছানো যায়। বাজার বা মূল সড়ক থেকে রিকশা বা ভ্যানযোগে নবগঙ্গা নদীর তীরবর্তী মদনমোহন মন্দিরে খুব সহজেই যাতায়াত করা সম্ভব।
৩. মাগুরায় কোথায় থাকবেন
মদনমোহন মন্দির কিংবা মাগুরার অন্যান্য ঐতিহাসিক স্থানগুলো ঘুরে দেখার জন্য রাত্রিযাপনের ক্ষেত্রে মাগুরা জেলা সদরকেই মূল ঘাঁটি হিসেবে বেছে নেওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক, কারণ শত্রুজিৎপুর এলাকায় বড় বা উন্নত মানের কোনো আবাসিক হোটেল নেই। মাগুরা সদরের কয়েকটি জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য আবাসিক হোটেলের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. হোটেল যমুনা (Hotel Jamuna):
- অবস্থান: ভায়না মোড়, ঝিনাইদহ রোড, মাগুরা সদর।
- বৈশিষ্ট্য: এটি মাগুরার অন্যতম মানসম্মত ও জনপ্রিয় হোটেল। এখানে এসি ও নন-এসি রুমের সুব্যবস্থা রয়েছে এবং শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় যাতায়াত অত্যন্ত সহজ। পরিবার নিয়ে থাকার জন্য এটি বেশ উপযোগী।
২. হোটেল গ্রীন প্যালেস গেস্ট হাউস (Hotel Green Palace Guest House):
- অবস্থান: আদর্শ কলেজ পাড়া, ভায়না মোড়, মাগুরা সদর।
- বৈশিষ্ট্য: পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ আবাসন, গাড়ি পার্কিং সুবিধা ও ২৪ ঘণ্টার রুম সার্ভিসের জন্য এটি বেশ নামকরা।
৩. অন্যান্য বাজেট হোটেল:
- মাগুরা নতুন বাস টার্মিনাল ও শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে আরও কিছু সাধারণ মানের বাজেট ফ্রেন্ডলি হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে, যেখানে স্বল্প খরচে রাত্রিযাপন করা যায়।
৪. সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: মদনমোহন মন্দির পরিদর্শনের উপযুক্ত সময় কোনটি?
উত্তর: বছরের যেকোনো সময়ই এখানে যাওয়া যায়। তবে ঝুলনযাত্রা, জন্মাষ্টমী কিংবা বিশেষ পূজা-পার্বণের দিনগুলোতে এখানে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। সাধারণ সময়ে শান্ত ও মনোরম পরিবেশে ঘুরে দেখার জন্য শীতকাল সবচেয়ে উপযোগী সময়।
প্রশ্ন ২: মন্দিরে প্রবেশের জন্য কি কোনো টিকিট বা প্রবেশমূল্য লাগে?
উত্তর: না, মদনমোহন মন্দির পরিদর্শনের জন্য কোনো ধরনের প্রবেশমূল্য বা টিকিট লাগে না। এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত।
প্রশ্ন ৩: শত্রুজিৎপুর বাজারে বা মন্দিরের আশেপাশে খাওয়ার জন্য ভালো কোনো হোটেল আছে কি?
উত্তর: শত্রুজিৎপুর বাজারে সাধারণ মানের কিছু খাবার হোটেল ও চায়ের দোকান রয়েছে। তবে উন্নত মানের খাবার বা রেস্তোরাঁর জন্য মাগুরা জেলা সদরে ফিরে আসাটাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
প্রশ্ন ৪: এই ঐতিহাসিক স্থানের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ কেমন?
উত্তর: নবগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই মন্দির চত্বরের চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ খুবই শান্ত ও স্নিগ্ধ। নদীর মৃদু হাওয়া এবং প্রাচীন জনপদের ইতিহাস এই স্থানটিকে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য দারুণ এক গন্তব্যে পরিণত করেছে।



