মাগুরা জেলা সদর থেকে উত্তর দিকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে শ্রীপুর উপজেলা সদরে অবস্থিত শ্রীপুর জমিদার বাড়ি বাংলার প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য ও রাজকীয় স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। সবুজে ঘেরা শ্রীপুর অঞ্চলে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এই জমিদার বাড়িটি ইতিহাসপ্রেমী ও ভ্রমণপিপাসুদের কাছে দারুণ এক আকর্ষণের স্থান। জমিদার বাড়ির প্রবেশদ্বারের ভগ্নাবশেষ আজও অতীতের সেই জাঁকজমকপূর্ণ দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। জমিদার বাড়ির পাশেই কবি কাজী কাদের নেয়াজের বাড়ি আছে সেটা দেখে যেতে পারে।
১. ইতিহাস ও পটভূমি
শ্রীপুর জমিদার বাড়ির ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং বাংলার প্রাচীন রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত:
- জমিদারী প্রতিষ্ঠা: শ্রীপুর উপজেলা সদরের ১ কিলোমিটারের মধ্যেই পাল রাজাদের রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। এই অঞ্চলে জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সারদারঞ্জন পাল চৌধুরী। শ্রীপুর ও এর পার্শ্ববর্তী বিশাল এলাকা এই জমিদারীর আওতাধীন ছিল। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, নবাব আলীবর্দী খানের নিকট থেকে এই জমিদারী খরিদ করা হয়েছিল।
- মহারাজা প্রতাপাদিত্যের সাথে সম্পর্ক: বৈবাহিক সূত্রে বাংলার বারো ভূঁইয়ার অন্যতম যশোরের মহারাজা প্রতাপাদিত্যের সাথে সারদারঞ্জন পাল চৌধুরীর পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। মহারাজা প্রতাপাদিত্যের ছেলে উদয়াদিত্যের সাথে জমিদার সারদারঞ্জন পাল চৌধুরীর মেয়ে বিভাপাল চৌধুরীর বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই ঐতিহাসিক সূত্র ধরেই বিখ্যাত রাজা প্রতাপাদিত্য একসময় শ্রীপুরে এসেছিলেন।
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বৌঠাকুরানীর হাট’ উপন্যাস: জনশ্রুতি রয়েছে যে, জমিদার কন্যা বিভাপাল চৌধুরীকে কেন্দ্র করেই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর বিখ্যাত ঐতিহাসিক উপন্যাস ‘বৌঠাকুরানীর হাট’ রচনা করেছিলেন।
- বর্তমান অবস্থা: কালের বিবর্তনে এবং সংরক্ষণের অভাবে এই বিশাল প্রাসাদতুল্য ও নয়নাভিরাম বাড়িটির সিংহভাগই আজ ধ্বংসের মুখে। বর্তমানে বাড়িটির মূল প্রবেশদ্বার তথা ঐতিহাসিক সিংহদ্বারটি ভগ্নাবশেষ হিসেবে কোনোমতে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

২. ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন
শ্রীপুর জমিদার বাড়ি পরিদর্শন করতে চাইলে প্রথমে আপনাকে রাজধানী ঢাকা থেকে সড়কপথে মাগুরা জেলা সদরে পৌঁছাতে হবে:
সড়কপথ (বাসে যাতায়াত):
- বাস নির্বাচন: ঢাকার গাবতলী, কলাবাগান, সায়েদাবাদ বা কল্যাণপুর বাস টার্মিনাল থেকে মাগুরা বা খুলনাগামী বিভিন্ন মানসম্মত এসি ও নন-এসি বাস (যেমন: হানিফ এন্টারপ্রাইজ, গোল্ডেন লাইন, ঈগল পরিবহন ইত্যাদি) নিয়মিত চলাচল করে। পদ্মা সেতু হয়ে এই বাসগুলোতে খুব সহজেই মাগুরায় পৌঁছানো যায়।
- ভাড়া ও সময়: ঢাকা থেকে মাগুরা পৌঁছাতে সাধারণত ৫ থেকে ৫.৫ ঘণ্টা সময় লাগে। বাসের টিকিটের মূল্য মানভেদে ৬০০ থেকে ১,৩০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
মাগুরা থেকে শ্রীপুর জমিদার বাড়ি:
- মাগুরা সদর থেকে উত্তর দিকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে শ্রীপুর উপজেলা সদর অবস্থিত।
- মাগুরা নতুন বাস টার্মিনাল বা শহর থেকে লোকাল বাস বা সিএনজিতে করে প্রথমে শ্রীপুর বাস স্ট্যান্ডে নামতে হবে। এরপর শ্রীপুর-সাচিলাপুর রাস্তা ধরে মাত্র ১ কিলোমিটার এগোলে বাম পার্শ্বেই এই ঐতিহাসিক জমিদার বাড়িটির দেখা মিলবে। স্ট্যান্ড থেকে রিকশা বা ভ্যানে করেও সেখানে যাওয়া যায়।
৩. মাগুরায় কোথায় থাকবেন
শ্রীপুর জমিদার বাড়ি কিংবা মাগুরার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো ঘুরে দেখার জন্য রাত্রিযাপনের ক্ষেত্রে মাগুরা জেলা সদরকেই মূল ঘাঁটি হিসেবে বেছে নেওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক, কারণ শ্রীপুর উপজেলায় বড় বা উন্নত কোনো আবাসিক হোটেল নেই। মাগুরা সদরের কয়েকটি জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য আবাসিক হোটেলের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. হোটেল যমুনা (Hotel Jamuna):
- অবস্থান: ভায়না মোড়, ঝিনাইদহ রোড, মাগুরা সদর।
- বৈশিষ্ট্য: এটি মাগুরার অন্যতম মানসম্মত ও জনপ্রিয় হোটেল। এখানে এসি ও নন-এসি রুমের সুব্যবস্থা রয়েছে এবং শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় যাতায়াত অত্যন্ত সহজ। পরিবার নিয়ে থাকার জন্য এটি বেশ উপযোগী।
২. হোটেল গ্রীন প্যালেস গেস্ট হাউস (Hotel Green Palace Guest House):
- অবস্থান: আদর্শ কলেজ পাড়া, ভায়না মোড়, মাগুরা সদর।
- বৈশিষ্ট্য: পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ আবাসন, গাড়ি পার্কিং সুবিধা ও ২৪ ঘণ্টার রুম সার্ভিসের জন্য এটি বেশ নামকরা।
৩. অন্যান্য বাজেট হোটেল:
- মাগুরা নতুন বাস টার্মিনাল ও শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে আরও কিছু সাধারণ মানের বাজেট ফ্রেন্ডলি হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে, যেখানে স্বল্প খরচে রাত্রিযাপন করা যায়।
৪. সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: শ্রীপুর জমিদার বাড়ি পরিদর্শনের উপযুক্ত সময় কোনটি?
উত্তর: বছরের যেকোনো সময়ই এখানে যাওয়া যায়। তবে আরামদায়ক আবহাওয়ায় ঘুরে বেড়ানোর জন্য অক্টোবর থেকে মার্চ মাস (শীতকাল) সবচেয়ে উপযোগী সময়।
প্রশ্ন ২: জমিদার বাড়িতে প্রবেশের জন্য কি কোনো টিকিট বা প্রবেশমূল্য লাগে?
উত্তর: না, শ্রীপুর জমিদার বাড়ির ভগ্নাবশেষ দেখার জন্য কোনো ধরনের প্রবেশমূল্য বা টিকিট লাগে না। এটি সকলের জন্য উন্মুক্ত।
প্রশ্ন ৩: শ্রীপুর উপজেলা সদরে খাওয়ার জন্য ভালো কোনো হোটেল বা রেস্তোরাঁ আছে কি?
উত্তর: শ্রীপুর উপজেলা বাজারে সাধারণ মানের কিছু খাবার হোটেল ও মিষ্টির দোকান রয়েছে। তবে উন্নত মানের খাবার বা রেস্তোরাঁর জন্য মাগুরা জেলা সদরে ফিরে আসাটাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
প্রশ্ন ৪: জমিদার বাড়ির বর্তমান অবস্থা কেমন? পর্যটকদের দেখার মতো কী আছে?
উত্তর: অযত্ন ও অবহেলায় জমিদার বাড়ির ভেতরের মূল ইমারতগুলো নষ্ট হয়ে গেলেও এর রাজকীয় সিংহদ্বার বা প্রবেশদ্বারটির ভগ্নাবশেষ এবং এর ঐতিহাসিক পটভূমি ভ্রমণপিপাসুদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করে।



