মাগুরার শ্রী শ্রী ন্যাংটা বাবার আশ্রম
Bangladesh - Magura

মাগুরার শ্রী শ্রী ন্যাংটা বাবার আশ্রম: ইতিহাস, যাতায়াত, কোথায় থাকবেন এবং সাধারণ জিজ্ঞাসা

মাগুরা জেলা শহরের অত্যন্ত কাছে এবং নবগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে অবস্থিত একটি আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক স্থান হলো শ্রী শ্রী ন্যাংটা বাবার আশ্রম। মাগুরা সদর থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার পূর্বে সাতদোহা গ্রামে অবস্থিত এই আশ্রমটি কেবল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছেই নয়, বরং ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল আধ্যাত্মিক সাধক ও দর্শনার্থীদের কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থান। নবগঙ্গার শান্ত জলরাশি এবং সবুজে ঘেরা পরিবেশ এই স্থানটিকে এক অন্যরকম প্রশান্ত রূপ দিয়েছে।

১. ইতিহাস ও লোককাহিনী

শ্রী শ্রী ন্যাংটা বাবার জীবন ও আধ্যাত্মিক সাধনার ইতিহাস এক অদ্ভুত ও অলৌকিক ঘটনার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

  • জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন: শ্রী শ্রী ন্যাংটা বাবা ১৯২৫ সালের ভাদ্র মাসে নড়াইল জেলার ভবানীপুর গ্রামে এক বারেন্দ্র শ্রেণীর ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শ্রী বেণীমাধব চক্রবর্তী এবং মাতার নাম পূর্ণসুন্দরী দেবী। শৈশব থেকেই তিনি আধ্যাত্মিক চিন্তা-চেতনায় মগ্ন ছিলেন।
  • সন্ন্যাস গ্রহণের অলৌকিক ঘটনা: প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর যখন তিনি সংসারের মায়ার জালে আবদ্ধ হওয়ার উপক্রম হন, তখন বৈরাগ্যবশে তিনি মাগুরার নবগঙ্গা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যান। এর পরের দিন একদল জেলের জালে একটি মৃতদেহ বা ভাসমান দেহ ধরা পড়ে বলে তারা মনে করেন এবং সন্ন্যাসীকে নদী থেকে উদ্ধার করেন। জেলেরা তাকে বিবস্ত্র অবস্থায় দেখে পোশাতে আচ্ছাদিত করতে চাইলেও কোনো বস্ত্র তার গায়ে থাকেনি। অলৌকিকভাবে তিনি আজীবন উলঙ্গ অবস্থাতেই পদ্মাসনে আসীন থেকে ধ্যানমগ্ন থাকতেন।
  • নামকরণ ও পাগলা কানাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ: বালক সন্ন্যাসী টানা তিন দিন ধ্যানমগ্ন থাকার পর মাগুরার বিখ্যাত লোককবি ও সাধক পাগলা কানাইয়ের সাথে তার আলাপ হয়। এই ঘটনার পর থেকেই তিনি ‘ন্যাংটা বাবা’ নামে পরিচিতি লাভ করেন।
  • সাতদোহা আশ্রমের অবস্থান: ঐতিহাসিক এই সাতদোহা আশ্রমটি মাগুরার পানি উন্নয়ন বোর্ডের মসজিদের বাম পার্শ্বের রাস্তা দিয়ে মাঝিপাড়ার ভেতর দিয়ে পারলা গ্রামের অভিমুখে গ্রামের শুরুতেই সাতদোহা পাড়ার সাতদোহা মহাশ্মশানে অবস্থিত। নবগঙ্গা নদীর তীরে এই শ্মশানঘাট ও আশ্রম চত্বরটি ভক্তদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র একটি স্থান।
মাগুরার শ্রী শ্রী ন্যাংটা বাবার আশ্রম

২. ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন

শ্রী শ্রী ন্যাংটা বাবার আশ্রম পরিদর্শন করতে চাইলে প্রথমে আপনাকে রাজধানী ঢাকা থেকে সড়কপথে মাগুরা জেলা সদরে পৌঁছাতে হবে:

সড়কপথ (বাসে যাতায়াত):

  • বাস নির্বাচন: ঢাকার গাবতলী, কলাবাগান, সায়েদাবাদ বা কল্যাণপুর বাস টার্মিনাল থেকে মাগুরা বা খুলনাগামী বিভিন্ন এসি ও নন-এসি বাস নিয়মিত চলাচল করে (যেমন: হানিফ এন্টারপ্রাইজ, গোল্ডেন লাইন, ঈগল পরিবহন ইত্যাদি)। পদ্মা সেতু হয়ে এই বাসগুলো খুব সহজেই মাগুরায় পৌঁছে যায়।
  • ভাড়া ও সময়: ঢাকা থেকে মাগুরা পৌঁছাতে সাধারণত ৫ থেকে ৫.৫ ঘণ্টা সময় লাগে। বাসের টিকিটের মূল্য মানভেদে ৬০০ থেকে ১,৩০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।

মাগুরা শহর থেকে আশ্রমে যাতায়াত:

  • মাগুরা জেলা শহর বা নতুন বাস টার্মিনাল থেকে মাত্র ১ কিলোমিটার পূর্বদিকে নবগঙ্গা নদীর দক্ষিণ তীরে সাতদোহা গ্রামে এই আশ্রম অবস্থিত।
  • মাগুরা শহর থেকে খুব সহজেই রিকশা, অটোভ্যান বা সিএনজিযোগে সরাসরি এই আশ্রমে যাতায়াত করা যায়। শহরের কেন্দ্রস্থল থেকে রিকশায় করে ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই সেখানে পৌঁছে যাওয়া সম্ভব।

৩. মাগুরায় কোথায় থাকবেন

ন্যাংটা বাবার আশ্রম বা মাগুরার অন্যান্য দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার জন্য রাত্রিযাপনের ক্ষেত্রে মাগুরা জেলা সদরকেই মূল ঘাঁটি হিসেবে বেছে নেওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক, কারণ আশ্রমের কাছাকাছি কোনো বড় বা উন্নত আবাসিক হোটেল নেই। মাগুরা সদরের কয়েকটি জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য আবাসিক হোটেলের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. হোটেল যমুনা (Hotel Jamuna):

  • অবস্থান: ভায়না মোড়, ঝিনাইদহ রোড, মাগুরা সদর।
  • বৈশিষ্ট্য: এটি মাগুরার অন্যতম মানসম্মত ও জনপ্রিয় হোটেল। এখানে এসি ও নন-এসি রুমের সুব্যবস্থা রয়েছে এবং শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় যাতায়াত অত্যন্ত সহজ। পরিবার নিয়ে থাকার জন্য এটি বেশ উপযোগী।

২. হোটেল গ্রীন প্যালেস গেস্ট হাউস (Hotel Green Palace Guest House):

  • অবস্থান: আদর্শ কলেজ পাড়া, ভায়না মোড়, মাগুরা সদর।
  • বৈশিষ্ট্য: পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ আবাসন, গাড়ি পার্কিং সুবিধা ও ২৪ ঘণ্টার রুম সার্ভিসের জন্য এটি বেশ নামকরা।

৩. অন্যান্য বাজেট হোটেল:

  • মাগুরা নতুন বাস টার্মিনাল ও শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে আরও কিছু সাধারণ মানের বাজেট ফ্রেন্ডলি হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে, যেখানে স্বল্প খরচে রাত্রিযাপন করা যায়।

৪. সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)

প্রশ্ন ১: ন্যাংটা বাবার আশ্রমে যাওয়ার উপযুক্ত সময় বা বিশেষ দিন কোনটি?

উত্তর: বছরের যেকোনো সময়ই এখানে যাওয়া যায়। তবে বিশেষ তিথি, বার্ষিক উৎসব বা সনাতন ধর্মীয় বিভিন্ন পূজার দিনগুলোতে এখানে দেশ-বিদেশ থেকে প্রচুর ভক্ত ও অনুসারীদের সমাগম ঘটে। সাধারণ সময়ে শান্ত পরিবেশে ঘুরে দেখার জন্য শীতকাল সবচেয়ে ভালো সময়।

প্রশ্ন ২: আশ্রমে প্রবেশের জন্য কি কোনো টিকিট বা প্রবেশমূল্য দিতে হয়?

উত্তর: না, শ্রী শ্রী ন্যাংটা বাবার আশ্রমে প্রবেশের জন্য কোনো ধরনের প্রবেশমূল্য বা টিকিট লাগে না। এটি সকলের জন্য উন্মুক্ত।

প্রশ্ন ৩: আশ্রমের আশেপাশে খাওয়ার জন্য কি কোনো হোটেল বা রেস্তোরাঁ আছে?

উত্তর: আশ্রমটি গ্রামীণ ও শ্মশানসংলগ্ন এলাকায় হওয়ায় সেখানে বড় কোনো রেস্তোরাঁ নেই। হালকা নাস্তা বা পানি শহর থেকেই সাথে রাখা ভালো। মূল খাওয়া-দাওয়ার জন্য মাগুরা শহর সদরে ফিরে আসাই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।

প্রশ্ন ৪: এই স্থানে যাতায়াতের রাস্তাঘাট কেমন?

উত্তর: মাগুরা শহর থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড বা পারলা এলাকা হয়ে আশ্রম পর্যন্ত যাতায়াতের রাস্তাটি পাকা ও চলাচল উপযোগী। রিকশা বা ভ্যানে করে খুব সহজেই যাতায়াত করা যায়।

Leave a Reply