মাগুরা জেলা শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে, ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক সংলগ্ন ইছাখাদা গ্রামে নবগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত হজরত পীর মোকাররম আলী শাহ (র:) এর দরগাহ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি অন্যতম বিখ্যাত ও আধ্যাত্মিক স্থান। ধর্মপ্রাণ মানুষ এবং ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে এটি একটি অত্যন্ত পবিত্র ও দর্শনীয় স্থান। সবুজে ঘেরা নদী তীরবর্তী এই মাজার প্রাঙ্গণ এক শান্ত ও আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।
১. ইতিহাস
বাংলার এই জনপদে ইসলাম প্রচার এবং আধ্যাত্মিক সাধনা প্রসারে যেক কয়জন বিশিষ্ট সুফি-সাধকের নাম স্মরণ করা হয়, তাদের মধ্যে হযরত পীর মোকাররম আলী শাহ (র:) অন্যতম।
- ঐতিহাসিক পটভূমি: আনুমানিক ১৪০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বিখ্যাত ইসলাম প্রচারক হযরত খান জাহান আলী (র:) ১২ জন শিষ্যসহ যশোরের বারবাজারে আগমন করেন এবং পরবর্তীতে সেখান থেকে বাগেরহাটের দিকে চলে যান। ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, হযরত খান জাহান আলী (র:)-এর অন্যতম শিষ্য বা সঙ্গী হিসেবে পীর হযরত মোকাররম আলী শাহ (র:) পর্যায়ক্রমে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বর্তমান মাগুরা জেলার ইছাখাদা অঞ্চলে এসে আস্তানা স্থাপন করেন।
- অলৌকিক ক্ষমতা ও জনকল্যাণ: জনশ্রুতি রয়েছে যে, সাধক পীর হযরত মোকাররম আলী শাহ (র:) অত্যন্ত উচ্চতর ও অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী একজন কামেল দরবেশ ছিলেন। তিনি ধর্ম প্রচারের পাশাপাশি ইছাখাদা গ্রামে সাধারণ মানুষের পানীয় জল ও দৈনন্দিন ব্যবহারের সুবিধার জন্য দুটি ঐতিহ্যবাহী পুকুর খনন করেন এবং একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। সেসময়ের সেই ঐতিহাসিক মসজিদের কিছু ভগ্নাবশেষ আজও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে রয়েছে।
- বার্ষিক ওরশ ও জনসমাগম: প্রতি বছর বাংলা মাঘ মাসের ৩ তারিখে এই দরগাহ প্রাঙ্গণে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে পবিত্র ‘ইসালে সওয়াব’ বা বার্ষিক ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। এই দিনটিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার ভক্ত, আশেকান ও দর্শনার্থী এখানে সমবেত হন। তাছাড়া বছরজুড়েই প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে এখানে ভক্ত ও ভ্রমণপিপাসুদের আগমন ঘটে।

২. ঢাকা থেকে কীভাবে যাবেন
হজরত পীর মোকাররম আলী শাহ (র:) এর দরগাহে যাওয়ার পথ অত্যন্ত সহজ ও সুগম। ঢাকা থেকে সড়কপথে খুব সহজেই এখানে পৌঁছানো সম্ভব:
বাসযোগে যাতায়াত:
- বাস নির্বাচন: ঢাকার গাবতলী, কলাবাগান, সায়েদাবাদ বা আবদুল্লাহপুর থেকে মাগুরা, ঝিনাইদহ বা খুলনাগামী বিভিন্ন স্বনামধন্য পরিবহণের বাস (যেমন: হানিফ এন্টারপ্রাইজ, সোহাগ পরিবহন, গোল্ডেন লাইন, ঈগল পরিবহন ইত্যাদি) নিয়মিত চলাচল করে। পদ্মা সেতু হয়ে এই বাসগুলো খুব দ্রুতই মাগুরায় পৌঁছে যায়।
- ভাড়া ও সময়: ঢাকা থেকে মাগুরা পৌঁছাতে সাধারণত ৫ থেকে ৫.৫ ঘণ্টা সময় লাগে। এসি ও নন-এসি ভেদে বাসের টিকিটের মূল্য সাধারণত ৬০০ থেকে ১,৩০০ টাকার মধ্যে হয়ে থাকে।
মাগুরা শহর থেকে দরগাহে যাতায়াত:
- মাগুরা জেলা শহর বা নতুন বাস টার্মিনাল থেকে জিরো পয়েন্ট হয়ে পশ্চিম দিকে মাগুরা-ঝিনাইদহ বিশ্বরোড দিয়ে প্রায় ৭ কিলোমিটার গেলে ইছাখাদা বাজার পাওয়া যায়।
- ইছাখাদার ডান দিকে (উত্তর দিকে) নবগঙ্গা নদীর তীরেই এই মাজার শরীফের অবস্থান। মাগুরা শহর থেকে লোকাল বাস, টেম্পু, সিএনজি, রিক্সা অথবা অটোভ্যানযোগে খুব সহজেই এই স্থানটিতে যাতায়াত করা যায়।
মাগুরা জেলায় ভ্রমণের সময় বা রাত্রিযাপনের জন্য বেশ কিছু ভালো মানের আবাসিক হোটেল ও গেস্টহাউস রয়েছে। মাগুরা সদর কিংবা বিভিন্ন উপজেলায় (যেমন মহম্মদপুর) ঘুরে বেড়ানোর সময় থাকার জন্য মূলত মাগুরা জেলা সদরকেই মূল ঘাঁটি বা কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বেছে নেওয়া সবচেয়ে সুবিধাজনক।
মাগুরায় থাকার জন্য উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয় কিছু হোটেলের তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
১. হোটেল যমুনা (Hotel Jamuna):
- অবস্থান: ভায়না মোড়, ঝিনাইদহ রোড, মাগুরা সদর।
- বৈশিষ্ট্য: এটি মাগুরার অন্যতম জনপ্রিয় ও মানসম্মত আবাসিক হোটেল। এখানে এসি ও নন-এসি উভয় প্রকার রুমের সুব্যবস্থা রয়েছে। শহরের কেন্দ্রস্থলে হওয়ায় যাতায়াত অত্যন্ত সহজ। পরিবার নিয়ে থাকার জন্য এটি বেশ উপযোগী।
২. হোটেল গ্রীন প্যালেস গেস্ট হাউস (Hotel Green Palace Guest House):
- অবস্থান: আদর্শ কলেজ পাড়া, ভায়না মোড়, মাগুরা সদর।
- বৈশিষ্ট্য: এটিও একটি পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ আবাসিক হোটেল। এখানে গাড়ি পার্কিংয়ের সুব্যবস্থা, ফ্রি ওয়াইফাই এবং ২৪ ঘণ্টার রুম সার্ভিস পাওয়া যায়।
৩. অন্যান্য সাধারণ ও বাজেট হোটেল:
- মাগুরা নতুন বাস টার্মিনাল ও শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে আরও কিছু সাধারণ মানের বাজেট ফ্রেন্ডলি হোটেল ও গেস্টহাউস (যেমন: হোটেল সৈকত, হোটেল মণ্ডল ইন্টারন্যাশনাল, হোটেল চৌরঙ্গী ইত্যাদি) রয়েছে। কম খরচে ও স্বল্প সময়ের জন্য থাকার জন্য এগুলো বেছে নেওয়া যেতে পারে।
ভ্রমণ টিপস: আপনি যদি রাজা সীতারাম রায়ের রাজপ্রাসাদ (মহম্মদপুর) কিংবা পীর মোকাররম আলী শাহের দরগাহ (ইছাখাদা) ভিজিট করতে চান, তবে মহম্মদপুর বা অন্যান্য উপজেলায় উন্নত মানের আবাসিক হোটেল না থাকায় মাগুরা সদর জেলাই রাত্রিযাপনের জন্য সেরা পছন্দ। সদর থেকে খুব সহজেই সিএনজি, বাস বা লোকাল যানবাহনে উক্ত স্থানগুলোতে যাতায়াত করা যায়।
৩. সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: পীর মোকাররম আলী শাহ (র:) এর দরগাহ পরিদর্শনের সেরা সময় কোনটি?
উত্তর: বছরের যেকোনো সময়ই এখানে যাওয়া যায়। তবে প্রতি বছর ৩ মাঘ তারিখে বার্ষিক ওরশের সময় এখানে সবচেয়ে বড় জমায়েত হয়। এছাড়া শীতকাল আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক সময়।
প্রশ্ন ২: মাজার শরিফ বা দরগাহে প্রবেশের জন্য কি কোনো নির্দিষ্ট সময় আছে?
উত্তর: সাধারণত দর্শনার্থীদের জন্য মাজার প্রাঙ্গণ সারা দিনই উন্মুক্ত থাকে। তবে জিয়াদরত বা ইবাদত করার জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়টি সবচেয়ে উপযুক্ত।
প্রশ্ন ৩: ইছাখাদা বা মাজারের আশেপাশে কি ভালো খাওয়ার হোটেল ও থাকার ব্যবস্থা আছে?
উত্তর: ইছাখাদা বাজার এলাকায় সাধারণ মানের কিছু খাবার হোটেল রয়েছে। তবে উন্নত মানের আবাসিক হোটেলের জন্য মাগুরা জেলা সদরে ফিরে যাওয়াই উত্তম। মাগুরা শহরে বেশ কিছু সাধারণ আবাসিক হোটেল (যেমন: হোটেল চলনতিকা, হোটেল ছায়া বীথি ইত্যাদি) রয়েছে।
প্রশ্ন ৪: এই ঐতিহাসিক স্থানে যাতায়াতের রাস্তাঘাট কেমন?
উত্তর: ঢাকা থেকে মাগুরার মহাসড়ক এবং মাগুরা শহর থেকে ইছাখাদা পর্যন্ত বিশ্বরোডের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই চমৎকার ও পাকা। মূল রোড থেকে দরগাহ পর্যন্ত যাতায়াতে স্থানীয় যানবাহনের সুব্যবস্থা রয়েছে।



